বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকাণ্ড জাতিকে কলঙ্কিত করেছে – হীরেন পণ্ডিত

পর্ব-১৬

তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হচ্ছে, বঙ্গবন্ধু তা জানতেন। কিন্তু দেশের মানুষ তাঁকে হত্যার ষড়যন্ত্র করছে, মনে হয় বঙ্গবন্ধু কল্পনাও করতে পারতেন না। জ্যামাইকায় কমনওয়েলথ সম্মেলনে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বঙ্গবন্ধু যেখানে বসে ছিলেন সেখানে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘শেখ সাহেব, আমাদের কাছে ভীতিকর খবর আছে। আপনার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চলছে। উত্তরে বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘ম্যাডাম ইন্দিরা, চিন্তা করবেন না। কোন বাঙালি আমাকে স্পর্শ করবে না। যদি তারা করে, আমি গলায় চাদর জড়িয়ে গ্রামে ফিরে যাব। শেখ মুজিব ক্ষমতার অধিকারী নন।’

বিশ্লেষকরা মনে করেন, রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড এবং সামরিক অভ্যুত্থানের জন্য প্রয়োজন দীর্ঘ প্রস্তুতি, সতর্ক পরিকল্পনা এবং তা কার্যকর করা। কিছু সংখ্যক অভ্যন্তরীণ ব্যক্তির অংশগ্রহণ এবং বিদেশী শক্তির সমর্থন এই বিষয়গুলিকে সহজ করে তোলে। সে ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী বা লক্ষ্য যদি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মতো কেউ হন, সেখানে কাজটি আরও চ্যালেঞ্জিং হতে পারে ঘাতকরা হয়তো এমনটিই ভেবেছে। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীরা সতর্কতার সাথে পরিকল্পনা করেছিল এবং পেশাগতভাবে সতর্ক হয়েই কাজটি করছিলো। দুর্ভাগ্যবশত, খুনিদের জন্য বিষয়গুলো বঙ্গবন্ধু নিজে কখনো বিশ্বাস করেননি, যে তাঁর বা তাঁর পরিবারের কোন ক্ষতি হতে পারে এ দেশের কোন মানুষের দ্বারা। বঙ্গবন্ধুর কিছু শুভাকাক্ষী তাঁকে সতর্ক করার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু তিনি তাদের সতর্কবাণীগুলোকে পাশ কাটিয়ে বা এড়িয়ে গিয়ে বলেছিলেন, বাংলাদেশের মানুষ কখনোই তাঁর কোন ক্ষতি করবে না।

জীবনের জন্য হুমকি আছে তা জানা সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব কখনো বিষয়টির প্রতি মনোযোগ ও গুরুত্ব কোনটাই দেননি। বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংস্থা বারবার সতর্ক করা সত্ত্বেও তিনি কখনো কল্পনা করেননি, যে বাংলার মানুষ তাঁকে হত্যা করতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যে, অসহিষ্ণু রাজনৈতিক পরিবেশ বঙ্গবন্ধুর হত্যার পথ প্রশস্ত করেছিলো। সদ্য স্বাধীন দেশে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির উত্থান, একাত্তরের পরাজিত বাহিনীর গোপন কর্মকাণ্ড, অন্যদিকে চরমপন্থী বাম দলের উত্থান, থানা আক্রমণ, ব্যাংক ডাকাতি, খুন ইত্যাদির কারণে মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে পড়ছিলো। ষড়ন্ত্রকারীরা এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করে। খুনিরা তাদের লক্ষ্য পূরণ করে। সফল মিশন শেষে বাংলাদেশকে পেছনের দিকে নিয়ে যাওয়া শুরু হয়। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের মধ্যে চরম বামপন্থী শক্তিগুলো বঙ্গবন্ধুর হত্যার জন্য পরিস্থিতি তৈরির জন্য অনেকাংশে দায়ী। সদ্য স্বাধীন দেশের ব্যবস্থাপনা নিয়ে একটি মতাদর্শিক দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। আওয়ামী লীগ নেতারা গণতন্ত্রকে তাদের প্রথম পছন্দ বলে মনে করতেন।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার একবার বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে তার তিনজন শত্রু রয়েছে। একজন শেখ মুজিবুর রহমান এবং অন্য দু’জন হলেন চিলির প্রেসিডেন্ট সালভাদর আলেন্দে এবং ভিয়েতনামের রাষ্ট্রনায়ক এনগুয়েন ভ্যান থু। তার রাজনৈতিক লক্ষ্য ছিল যেভাবেই হোক তাঁদের তিনজনকে উৎখাত করা। তিনজনের মধ্যে তিনি বঙ্গবন্ধুর প্রতি সবচেয়ে বেশি অসন্তুষ্ট ছিলেন, কারণ শেখ মুজিবের কারণে ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের ফলে পাকিস্তানের সাহায্যে চীন-মার্কিন সম্পর্ক গড়ে তোলার তার পরিকল্পনাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করেছিল। শুধু তাই নয়, বঙ্গবন্ধুর সাথে সে সময় মার্কিন রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী ভারত ও রাশিয়ার ভালো সম্পর্ক ছি, যা মার্কিনদের জন্য নেতিবাচক ছিল। তাই তিনি যে কোন মূল্যে তিনি মুজিবকে উৎখাত করে বাংলাদেশে তাদের নিজের অনুকূল শাসন প্রতিষ্ঠা করার ইচ্ছা পোষণ করেন।

বঙ্গবন্ধুর নৃশংস হত্যাকাণ্ডে বাংলাদেশের বেসামরিক প্রশাসনকেন্দ্রিক রাজনীতিতে প্রথম সরাসরি সামরিক বাহিনীর কিছু পথভ্রষ্ট মধ্যম ও নিম্নসারির অফিসার ও সামরিক বাহিনীর সদস্যদের হস্তক্ষেপ ছিল। তবে এর পরের ইতিহাস ভিন্ন। এই হত্যাকাণ্ডকে বাংলাদেশে একটি আদর্শিক মোড় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিশ্লেষকরা একমত যে এটি নিছক একটি হত্যাকাণ্ড নয়, এর পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল। হত্যা মামলার রায়ে সংক্ষেপে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের কথাও বলা হয়েছে। যাই হোক, নির্মম হত্যাকাণ্ডের পিছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য এবং তৎকালীন রাজনীতিবিদদের সাথে জড়িত থাকার বিষয়টি বিচারের পরেও অস্পষ্ট ছিল।

বিশ্লেষকদের মতে, এটা মোটেও সহজ কাজ নয় যে, কিছু সংখ্যক সেনা সদস্য জাতির পিতাকে তাদের পরিবারসহ নিরস্ত্র মানুষদের ট্যাঙ্ক নিয়ে গিয়ে সপরিবারে হত্যা করবে পাশাপাশি রেডিও এবং টেলিভিশনে গিয়ে জাতির কাছে বঙ্গবন্ধু হত্যার খবর দেবে। বঙ্গবন্ধু ছিলেন একজন জাতীয়তাবাদী নেতা। জাতির স্বার্থে, দেশের স্বার্থে অনেক কিছু করেছেন, জীবনে বেশিরভাগ সময় জেলে কাটিয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশ, যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং সৌদি আরব যুদ্ধে পাকিস্তানের পক্ষে ছিল। মূলত ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের পরাজয়ের সঙ্গে সঙ্গে সমর্থন প্রদানের কারণে তারাও পরাজিত হয়েছিল। অন্যদিকে, সারা বিশ্বে কোল্ড ওয়ার যুদ্ধ চলছিল। বিশ্ব রাজনীতি তখন অশান্ত। বঙ্গবন্ধু আঞ্চলিক রাজনীতিতে একটি বিশাল ফ্যাক্টর ছিলেন। স্বাভাবিকভাবেই বঙ্গবন্ধু ছিলেন এই কোল্ড ওয়ারের শিকার। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ফলে উপমহাদেশের রাজনীতি দুর্বল হয়ে পড়ে।

গবেষকদের মতে, মুজিব হত্যার দু’টি মাত্রা রয়েছে। একটি অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং অন্যটি আন্তর্জাতিক। বিচারে এর কোনোটাই আসেনি। দেশের প্রথাগত আইনে অন্যান্য দশটি হত্যার মতোই বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিচার হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর নৃশংস হত্যার পটভূমি প্রসঙ্গে তেমন কিছু উঠে আসেনি। ঘাতকরা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে রাষ্ট্রের আত্মাকেই হত্যা করতে চেয়েছে। হত্যা করে জাতীয়তাবাদ, অসাম্প্র্রদায়িক, গণতান্ত্রিক, শোষণমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নকে। সামরিক শাসনের মাধ্যমে রাষ্ট্রের চার নীতিকে অবমাননা করা হয়। বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিচার হয়েছে। কিন্তু বিচারে ষড়যন্ত্রের কথা উঠে আসেনি।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর, আওয়ামী লীগের জন্য একটি কঠিন সময় ছিল। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর তাঁর পরিবারের সদস্যদেরও হত্যা করা হয় যাতে কেউ আওয়ামী লীগের হাল ধরতে না পারে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে হত্যার জন্য, দলের চার জাতীয় নেতাকেও ৩রা নভেম্বর কারাগারে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। দলের নেতারা বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত ছিলেন। প্রবীণ নেতাদের কেউ কেউ বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন। নেতৃত্বের অস্থিরতা ছিল। নেতৃত্বের কাপুরুষতা ছিল। কেউ কেউ বঙ্গবন্ধুর রক্তের সিঁড়ি বেয়ে খন্দকার মোশতাকের মন্ত্রিসভায় যোগ দেন। সারাদেশে দলের নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার করা হয় সেই সময়ে । চালানো হয় অমানবিক নির্যাতন। তাদের ঘরবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। অনেক নেতাকর্মীকে হত্যা করা হয়।

এ ধরনের মর্মান্তিক ঘটনা রোধের আহবান জানাতে পারেন নি তারপরেও দলের তৃণমূল নেতারা হাল ছাড়েননি। তারা চেয়েছিল কেউ একজন প্রতিরোধে এগিয়ে আসুক। কিন্তু সেই আহবান জানানোর জন্য কেউ ছিলেন না। ফলে কঠিন হয়েছিলো আওয়ামী লীগের রাজনীতি। বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা বিদেশে অনেক কষ্টে জীবন-যাপন করেছেন।

বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিশোধের আগুন ছিলো আওয়ামী লীগের হৃদয়ে। সাংগঠনিক কার্যক্রম ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে। আওয়ামী লীগের তৎকালীন কাউন্সিলকে ঘিরে সারাদেশে নেতাকর্মীরা চাঙ্গা ও সংগঠিত হয়েছিল। অধিবেশনে অবিলম্বে সামরিক আইন প্রত্যাহার এবং সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে জনপ্রতিনিধিদের ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি জানানো হয়। তারা কারাগারে থাকা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মুক্তি এবং ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ড ও জেলহত্যার বিচার দাবি করেন।

স্বাধীনতা যুদ্ধে চূড়ান্ত বিজয়ের পর বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পান এবং ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে আসেন। তিনি দেশের সংবিধান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং অর্থনীতি পুনর্গঠনে কাজ শুরু করেন। স্বাধীনতার পর পরাজিত শক্তি, দেশি -বিদেশি ষড়যন্ত্রকারীরা দেশের অর্থনীতি ও রাজনীতির বিরুদ্ধে নানা ষড়যন্ত্র শুরু করে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের আগে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তার পরিবারকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাতে হত্যা করা হয়, তখন বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ছিলেন। ১৫ আগস্ট শুধু বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি বড় দুর্যোগ নয়, এটি বিশ্বের ইতিহাসের একটি কলঙ্কজনক অধ্যায়। স্বাধীনতার মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধু এবং তার স্ত্রী ও সন্তানদের দেশ স্বাধীন হওয়ার মাত্র সাড়ে তিন বছর পর হত্যা করা হয়, যা পৃথিবীর ইতিহাসে কোন নজির নেই।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারকে হত্যার পর সারা বিশ্বে তীব্র শোকের ছায়া নেমে আসে এবং বিদ্বেষের বিষ ছড়িয়ে পড়ে। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর বাংলাদেশের মানুষ বিশ্বজুড়ে মানুষ হিসেবে তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা ও বিশ^স্ততা হারায়। বিদেশিরা মনে করতো যে বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে হত্যা করতে পারে তারা যে কোনো জঘন্য কাজ করতে পারে।

১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে, সাহসী বাঙালিরা নিজেদেরকে একটি কাপুরুষ-আত্মঘাতী জাতি হিসেবে এবং বিশ্বাসঘাতক হিসেবে বিশ্বের কাছে পরিচয় করিয়ে দেয়। বাঙালি জাতির স্বপ্নদ্রষ্টা শেখ মুজিবকে হত্যার মাধ্যমে বাঙালি জাতি তার আত্মঘাতী চরিত্র বিশ্ববাসীকে দেখিয়েছে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে স্বাধীনতার চেতনাকে নির্বাসন দেওয়া হয়েছিলো। মানুষ মনে করেছে বঙ্গবন্ধু ছাড়া বাংলাদেশের প্রকৃত অস্তিত্ব নেই। এটা সহজেই বলা যেতে পারে যে, বাঙালি জাতির চেতনার নাম, একটি স্বপ্নের নাম, সৃষ্টির ইতিহাসের নাম, আকাক্সক্ষার নাম, সংগ্রামের নাম এবং সাফল্যের নাম – তাহলে তার মূর্ত প্রতীক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি ইতিহাসের মহানায়ক। বঙ্গবন্ধু চিরকাল বাঙালির হৃদয়ে অমর হয়ে আছেন থাকবেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি বলেছেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার ষড়যন্ত্রের পেছনের অপরাধীরা একদিন প্রকাশ পাবে। তিনি ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করেছেন।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও গবেষক

বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকাণ্ড জাতিকে কলঙ্কিত করেছে
Comments (0)
Add Comment