করোনার মহামারীতে মৃৎশিল্প বিলুপ্তীর পথে

মেহেদী হাসান আকন্দ: প্রাচীনকাল থেকে মাটির তৈরি তৈজসপত্র ও নানান ব্যবহারিক সামগ্রীর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাঙালির অস্থিত্ব। প্লাস্টিকের তৈরি বাহারি তৈজসপত্রের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মাটির তৈরি পণ্যের চাহিদা কমে যাওয়া, মূলধনের অভাব, কাঁচামালের দুষ্প্রাপ্যতা এবং স্বল্প আয়ের কারণে জনপ্রিয় এ শিল্প এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে।

সরেজমিনে নেত্রকোণার সদর উপজেলার আমতলা ইউনিয়নে পালপাড়া গ্রামের বিভিন্ন মৃৎশিল্পিদের সাথে কথা বলে জানা যায়, মৃৎশিল্পে জড়িত কারীগরদের প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান না থাকলেও এ শিল্পের কাজে তারা দক্ষ জনশক্তি। পুরুষদের তুলনায় নারীরা অধিক দক্ষ ও পরিশ্রমী। যুগ যুগ ধরে এ গ্রামের প্রায় ৫০টি পরিবার ঐতিহ্যবাহী এ শিল্পের সাথে জড়িত ছিল। প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা আর প্রযুক্তি বিকাশের এ যুগে এ শিল্পের প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ সাধিত না হওয়ায় তা আজ আর প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না।

ফলে বাপ-দাদার পেশা ছেড়ে অনেকে অন্য পেশার দিকে ঝুঁকে পড়েছেন। আগেরকার দিনে মৃৎশিল্পের প্রয়োজনীয় উপকরণ যেমন: এঁটেল মাটি, রঙ, যন্ত্রপাতি ও জ্বালানি ছিল সহজলভ্য। কিন্তু বর্তমানে এসব প্রয়োজনীয় উপকরণের দুমূর্ল্যের কারণে তারা হিমশিম খাচ্ছেন। তাই জীবিকার তাগিদে এ পেশা ছেড়ে সবাই অন্য পেশা বেছে নিয়েছে। মাত্র কয়েকটি পরিবার এখনো তাদের বংশ পরম্পরায় চলে আসা ঐতিহ্যকে আঁকড়ে ধরে জীবিকা নির্বাহ করছে।

মৃৎশিল্পী নিরঞ্জন জানান, মাটির তৈজসপত্র তৈরি করে বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে ঘুরে বিক্রি করে সংসার চালাতেন। কিন্তু প্লাস্টিকের তৈরি বাহারি তৈজসপত্রের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মাটির তৈরি পণ্যের চাহিদা কমে যাওয়ায় এই পেশায় জীবিকা নির্বাহ করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মৃৎশিল্পী মিতা রানী, নিশা রানী, দিপালী রানী, তুলশী রানী, স্বরষতী রানী ও রুমা রানীসহ কয়েকটি পরিবার এখনো এ পেশায় জড়িত আছে। তারা জানান, মৃৎশিল্পের পণ্যের আলাদা নান্দনিক শিল্পমূল্য থাকায় যুগ যুগ ধরে বংশ পরম্পরায় এ পেশার সাথে জড়িত। তারা এখন মাটির তৈরি হাঁড়ি-পাতিল, থালা-বাসন, সানকি, ঘটি, সরা, কলস, সাজ, ব্যাংক, প্রদীপ, পুতুল, কলকি, বিভিন্ন জীবজন্তু ও দেবদেবীর মূর্তি খেলনা সামগ্রী হিসাবে তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করছে।

স্বরষতী রানী জানান, বছরজুড়ে কয়েকটি মেলাকে কেন্দ্র করেই এসব খেলনা সামগ্রী তারা তৈরি করেন। যেমন, পৌষ মেলা, বারনী মেলা, দোল মেলা, অষ্টমী মেলা, চৈত্র মেলা ও বৈশাখী মেলা। গত এক বছর ধরে কোভিট-১৯ করোনার মহামারীর কারণে মেলাগুলো ঠিকমতো না হওয়ায় মাটির তৈরি খেলনা সামগ্রী বিক্রি করতে না পারায় তারা এখন মানবিক জীবন-যাপন করছেন। চৈত্র মেলা ও বৈশাখী মেলাকে সামনে রেখে প্রায় ৫০হাজার টাকার খেলনা সামগ্রী তিনি তৈরি করে রেখেছেন। বর্তমানে করোনার প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়ায় মেলার অনিশ্চয়তা দেখা দেওয়ায় চরম হতাশায় ভুগছেন তিনি।

মৃত ঝুটন চন্দ্র পালের স্ত্রী রুমা রানী জানান, প্রায় ৬বছর আগে স্বামীকে হারান আর ১০ বছর আগে হারান ছেলে লিটন চন্দ্র পালকে। ছেলের বিধবা স্ত্রী ও নাতনীকে নিয়ে মাটির তৈজসপত্র ও খেলনা সামগ্রী তৈরি করেই তাদের জীবিকা নির্বাহ। নিজস্ব পুঁজি না থাকায়  তৈজসপত্র তৈরির কাঁচামাল ও পোড়ানোর লাকড়ী সংগ্রহের জন্য একটি এনজিও থেকে ৫০হাজার টাকা তিনি ঋণ নিয়েছেন। প্রতি সপ্তাহে ১হাজার ৩’শ ৫০টাকা করে কিস্তি পরিশোধ করতে হয়। বৃদ্ধা রুমা রানী বলেন, করোনার সংকটে এনজিওর কিস্তি পরিশোধ করে সংসার চালাতে তিনি দিশাহারা হয়ে পড়েছেন। তিনি বলেন, সরকারি পৃষ্টপোষকতা না পেলে বাঙালির ঐতিহ্যময় এ শিল্প ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মরা শুধু বই পুস্তুকেই পড়বে বাঙালির ঐতিহ্যময় মৃৎশিল্পের গল্পকথা।

করোনার মহামারীতে মৃৎশিল্প বিলুপ্তীর পথেমৃৎশিল্পমৃৎশিল্প বিলুপ্তীর পথে
Comments (0)
Add Comment