মেঘনা থেকে পদ্মাপাড় পর্যন্ত রাজউক

বিডি২৪ভিউজ ডেস্ক : রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) পরিধি বা আয়তন বাড়ানোর চিন্তা করছে সরকার। রাজউকের সীমানা বিস্তৃত হবে মেঘনাপাড় থেকে পদ্মাপাড় পর্যন্ত। অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা ওই জনপদে পরিকল্পিত ও টেকসই উন্নয়নের কথা ভাবছে সরকার।

বিশেষজ্ঞদের অনেকের ভিন্নমতও রয়েছে এ বিষয়ে। তারা মনে করেন, রাজউক বিদ্যমান পরিধি বা আয়তনের সঠিক ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। ফলে এ সংস্থার আয়তন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত কতটুকু যৌক্তিক হবে তা ভেবে দেখা দরকার।

তাদের মতে, ঢাকা ও আশপাশের এলাকার জলাশয়, পুকুর-ডোবা-নালা রক্ষার দায়িত্ব ছিল রাজউকের। জনবল স্বল্পতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার অভাবে তারা সে দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করতে পারছে না। রাজউকের বিদ্যমান সীমার মধ্যে ব্যক্তি উদ্যোগে জলাভূমি, নিচুজমি, কৃষিজমি ভরাট করে নানা স্থাপনা গড়ে উঠেছে, উঠছে। রাজউক সেসব নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজউকের আওতাধীন সাভার, কেরানীগঞ্জ, ভাটারা, দক্ষিণগাঁও, উত্তরখান, দক্ষিণখান, তুরাগ, ডেমরা প্রভৃতি এলাকায় রাজউক নজর দেয়নি। এ অবস্থায় আয়তন বাড়ানো হলে সেখানেও তারা সঠিক ব্যবস্থাপনা করতে পারবে না। রাজউকের সংস্কার করে সক্ষমতা বাড়ানো গেলে বিদ্যমান ও নতুন এলাকায় কার্যকারিতা দেখানো সম্ভব হবে। রাজউকের বিস্তারণের ক্ষেত্রে সরকারের সংশ্লিষ্টদের এ বিষয়গুলো খেয়াল রাখতে হবে।

চলতি বছরের শুরু থেকে রাজউকের আয়তন বাড়ানোর বিষয়টি আলোচনায় আসে। তবে বিষয়টি স্পষ্ট হয় জুনে। গত ২০ জুন জাতীয় সংসদে গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদ জানান, ঢাকার পুবে মেঘনা নদী ও পশ্চিমে (বাস্তবে দক্ষিণ-পশ্চিমে) পদ্মা সেতু পর্যন্ত রাজউকের সীমানা বিস্তৃত করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। সরকারের অনুশাসন পেলে রাজউক এ ব্যাপারে কার্যকর উদ্যোগ নেবে। রাজউক বর্তমানে ১ হাজার ৫২৮ বর্গকিলোমিটার এলাকায় বিস্তৃত। এখানে প্রশাসনিক অঞ্চল রয়েছে আটটি। এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকা, নারায়ণগঞ্জ, সাভার, কেরানীগঞ্জ ও গাজীপুর। সম্প্রতি গাজীপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (গাউক) চেয়ারম্যান নিয়োগ করে ওই প্রতিষ্ঠানকে সক্রিয় করেছে সরকার। গাজীপুরের ৫৯০ বর্গকিলোমিটার এলাকা ছেড়ে দিয়েছে রাজউক। এখন রাজউকের আওতায় রয়েছে ৯৩৮ বর্গকিলোমিটার।

পরিকল্পিত ও টেকসই নগর উন্নয়ন এবং নাগরিক সেবার বিশাল দায়িত্ব পালন করছে রাজউক। কিছু অসাধু কর্মকর্তার কারণে রাজউকের অনেক বদনামও হচ্ছে। তবে প্রশাসন বলছে, তারা এ ব্যাপারে কঠোর। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) রাজউক বিষয়ক এক গবেষণা-প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজউক আর দুর্নীতি সমার্থক শব্দে পরিণত হয়েছে। রাজউক মুনাফা অর্জনকারী ও লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে, কিন্তু জনবান্ধব হতে পারেনি।

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজউকে ঘুষ ছাড়া সেবা বিরল। ইমারত নির্মাণের নকশার অনুমোদন পেতে ৫০ হাজার থেকে ২ কোটি টাকা ঘুষ দিতে হয়। রাজউক কর্মকর্তা, দালাল ও সেবাগ্রহীতাদের একাংশ ত্রিপক্ষীয় আঁতাত নির্দিষ্ট হারে ঘুষ নেয়। এসব দুর্বলতা রাজউককে অনেক সময় যথাদায়িত্ব পালন করতে দেয় না। অংশীদের পরামর্শ রাজউককে এর থেকে বের করে আনতে হবে।

রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) প্রেসিডেন্ট আলমগীর সামসুল আলামিন (কাজল) দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাজউকের আয়তন বাড়ানো যেতে পারে। তাহলে অন্যান্য এলাকায়ও পরিকল্পিত উন্নয়ন ঘটবে। ঢাকা শহরের ওপর চাপ কমবে। এজন্য দক্ষ জনবল লাগবে।’

এফবিসিসিআইয়ের আবাসন-সংক্রান্ড স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী ভূঁইয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাজউক পরিকল্পিত ও টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে আয়তন বাড়াতে পারে। এজন্য আগে রাজউকের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। দক্ষ জনবল লাগবে। এরপর সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’

নগরপরিকল্পনাবিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মেঘনা থেকে পদ্মাপাড় পর্যন্ত পরিকল্পিত উন্নয়নের চিন্তা ইতিবাচক। রাজউকের আয়তন না বাড়িয়ে উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদের সক্ষমতা বাড়িয়েও তা করা সম্ভব।’

ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাজউক বিদ্যমান আয়তনের মধ্যেই তার দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করতে পারছে না। ফলে রাজউকের সীমানা বাড়ানোর চিন্তা করা যায় না। প্রতিষ্ঠানটির সংস্কার করে সক্ষমতা বাড়ালে তা সম্ভব হতে পারে।’

রাজউক চেয়ারম্যান মো. আনিছুর রহমান মিঞা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাজউক আয়তন বাড়াতে চায় না। তবে সরকার বাড়াতে বললে তাতে সম্মত থাকবে। ঢাকার আশপাশে রাজউক এলাকার কাছাকাছি এলাকায় পরিকল্পিত নগরায়ণের অনেক সম্ভাবনা রয়েছে। সেসব এলাকা রাজউকের আওতায় এলে সেখানেও পরিকল্পিত উন্নয়ন করা সম্ভব। ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কের দুপাশে পাল্লা দিয়ে অপরিকল্পিত উন্নয়ন হচ্ছে, এর নিয়ন্ত্রণ দরকার। সরকার দায়িত্ব দিলে রাজউক তা পালনে আগ্রহী।’

বিদ্যমান আয়তনের পরিকল্পিত উন্নয়ন ও উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পালনে সফল না হলেও আয়তন বাড়াতে আগ্রহ কেন? এমন প্রশ্নের জবাবে রাজউক চেয়ারম্যান বলেন, ‘রাজউককে সেভাবে গড়ে তোলা হলে এমন অবস্থার সৃষ্টি হতো না। এখন অনেক পরিবর্তন হয়েছে। নতুন অনেক জনবল নিয়োগ হচ্ছে। নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে রাজউকের জনবল দাঁড়াবে প্রায় দেড় হাজারে।’

গৃহায়ন ও গণপূর্ত সচিব কাজী ওয়াছি উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাজউকের আয়তন বাড়ানোর বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে আলোচনা হচ্ছে। যেসব এলাকা রাজউকের আওতায় আনার আলোচনা চলছে, ওইসব এলাকাকে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।’

প্রসঙ্গত, ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ শহরের উন্নয়নের জন্য ১৯৫৬ সালে ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট (ডিআইটি) করা হয়। টাউন ইমপ্রুভমেন্ট অ্যাক্ট-১৯৫৩ অনুসরণ করে এটা করা হয়। ১৯৭০ ও ১৯৮০ সালের দিকে ঢাকা ও আশপাশে দ্রুত নগরায়ণ হয়। তখন ডিআইটির সংশোধনের জন্য সরকার প্রশাসনিক ও আইনগত কাঠামো সংশোধনের উদ্যোগ নেয়। ফলে টাউন ইমপ্রুভমেন্ট (সংশোধনী) আইন ১৯৮৭ হয়, যার মাধ্যমে ডিআইটি রাজউকে রূপান্তরিত হয়। ১৯৯১ সালে রাজউকের আয়তন ৩২০ থেকে ৫৯০ বর্গমাইল (১ হাজার ৫২৮ বর্গকিলোমিটার) করা হয়। গাজীপুর অংশ ছেড়ে দেওয়ার পর বর্তমান রাজউকের আয়তন ৯৩৮ বর্গকিলোমিটার।

রাজউক
Comments (0)
Add Comment