ভারতে রেকর্ড ১.২৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি

0

বিডি২৪ভিউজ ডেস্ক : বাংলাদেশ ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ভারতের বাজারে ১২৫ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছিল; যা ছিল এযাবৎকালের সর্বোচ্চ। করোনার কারণে ২০১৯-২০ অর্থবছরে তা কমে ১০৯ কোটি ৬১ লাখ ৬০ হাজার ডলারে নেমে আসে। মহামারি করোনাভাইরাসের মধ্যে ভারতে পণ্য রপ্তানিতে রেকর্ড গড়েছে বাংলাদেশ।

৩০ জুন শেষ হওয়া ২০২০-২১ অর্থবছরে ভারতে ১২৭ কোটি ৯৬ লাখ ৭০ হাজার (প্রায় ১.২৮ বিলিয়ন) ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ। এই অঙ্ক ২০১৯-২০ অর্থবছরের চেয়ে প্রায় ১৭ শতাংশ বেশি। এটি বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৩ দশমিক ৩ শতাংশ। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানিতে শীর্ষ ১০ রপ্তানিকারক দেশের মধ্যে সপ্তম স্থানে চলে এসেছে নরেন্দ্র মোদির ভারত। অথচ, তিন বছর আগেও শীর্ষ ১০ রপ্তানিকারক দেশের তালিকায় ভারতের স্থান ছিল না।

তবে রপ্তানি বাড়লেও ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি এখনও বিশাল। সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরের চূড়ান্ত হিসাব পাওয়া না গেলেও আগের কয়েক বছর সেটি পাঁচ থেকে ছয়শ কোটি ডলারের ঘরে ছিল। মহামারির ছোবল না লাগলে দেশটিতে পণ্য রপ্তানি থেকে আরও বেশি বিদেশি মুদ্রা আসত বলে রপ্তানিকারক ও অর্থনীতির গবেষকরা জানিয়েছেন।

তারা বলেছেন, দুই সপ্তাহ আগেও ভারতের করোনা পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ। বাংলাদেশেও একই অবস্থা। সে কারণে গত অর্থবছরের শেষ দিকে দুই দেশেরই আমদানি-রপ্তানি ব্যাহত হয়েছে। তবে এখন একটা বেশ ভালো পরিবেশ দেখা দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে দুই দেশের সরকারের মধ্যেও বেশ ভালো সম্পর্ক বিরাজ করছে। আমরা কিছু উদ্যোগ নিলে এখন ভারতে বাংলাদেশের রপ্তানি আরও বাড়ানো সম্ভব বলে মনে করেন তারা।

২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাংলাদেশ ভারতের বাজারে ১২৫ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছিল; যা ছিল এযাবৎকালের সর্বোচ্চ। করোনার কারণে ২০১৯-২০ অর্থবছরে ভারতে তা কমে ১০৯ কোটি ৬১ লাখ ৬০ হাজার ডলারে নেমে আসে।

কোন কোন পণ্য রপ্তানি এই আর্থিক বছরে বাংলাদেশ ভারতের বাজারে ৪২ কোটি ১৮ লাখ ৬০ হাজার ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। এরমধ্যে ওভেন পোশাক রপ্তানি থেকে এসেছে ২৫ কোটি ৩৫ লাখ ডলার; আর নিট থেকে এসেছে ১৬ কোটি ৮৭ লাখ ডলার।

পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি করে ১৩ কোটি ৪ লাখ ২০ হাজার ডলার, সুতা ও সুতা জাতীয় পণ্য থেকে ৩ কোটি ৪১ লাখ ৩০ হাজার ডলার, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য থেকে ৫ কোটি ১৭ লাখ ডলার এবং প্লাস্টিক দ্রব্য থেকে ১ কোটি ১৭ লাখ ১০ হাজার ডলার আয় করেছে বাংলাদেশ।

ভারত সরকারের যে সুবিধায় রপ্তানিতে উল্লম্ফন ২০১১ সালের নভেম্বর মাসে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং দক্ষিণ এশিয়ার স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য ভারতের স্পর্শকাতর পণ্যতালিকা ৪৮০টি থেকে কমিয়ে মাত্র ২৫টিতে নামিয়ে আনার ঘোষণা দেন। এর মধ্য দিয়েই কার্যত বাংলাদেশকে ভারতের বাজারে প্রায় শতভাগ শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা প্রদান করা হয়।

প্রতিবেশী হওয়ায় বিশ্বের যে কোনো দেশের তুলনায় এখানে কম খরচে পণ্য রপ্তানি হওয়ার কথা। স্বাভাবিক নিয়মেই এই বিপুল পরিমাণ শুল্ক সুবিধায় বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়ার কথা। এই সম্ভাবনা দেখে ২০১৮ সালের এক গবেষণায় বিশ্বব্যাংক বলেছিল, বাণিজ্য সম্ভাবনাগুলো কাজে লাগানো গেলে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ১৬ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত উন্নীত হতে পারে।

কিন্তু বাস্তবে তা বাড়ছে না, উল্টো আমদানির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে রপ্তানির গতি ও চাহিদা প্রত্যাশিত হারে না বাড়াসহ নানারকম অশুল্ক বাধার বেড়াজালে এখনও দুই দেশের বাণিজ্যে যোজন-যোজন দূরত্ব। একই সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যও ৯ বিলিয়ন ডলারের বৃত্ত অতিক্রম করতে পারছে না।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান ভারতে রপ্তানির ক্ষেত্রে পণ্য, স্থান ও কালভেদে অশুল্ক বাধার ধরণ বিশদভাবে পর্যালোচনা করেছেন। সংবাদ মাধ্যমকে তিনি বলেন, ‘দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের প্রায় অর্ধেকই হয় স্থলবন্দরগুলোর মাধ্যমে। এ প্রক্রিয়ায় নো ম্যানস ল্যান্ডে পণ্য খালাস ও উত্তোলন করতে হয়। এতে একদিকে বিলম্ব ঘটে, অন্যদিকে পণ্যের দাম চড়ে যায়।

‘আবার মিউচ্যুয়াল রিকগনিশন অ্যাগ্রিমেন্ট না থাকায় দূরবর্তী টেস্টিং সেন্টার থেকে পরীক্ষণ-সমীক্ষণের ফলাফল না আসা পর্যন্ত পণ্য বন্দরেই পড়ে থাকে। অন্যদিকে শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত সুবিধা দিলেও বাংলাদেশ তা কাজে লাগাতে পারছে না পরিবহন, বিনিয়োগ ও লজিস্টিকস কানেক্টিভিটির উন্নতি না হওয়ার কারণে। সেখানে অনেক ঘাটতি আছে।

‘ফলে শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত সুবিধা সত্বেও ঢাকা-দিল্লি পণ্য পরিবহন খরচ ঢাকা থেকে ইউরোপীয় বা মার্কিন বন্দরে পরিবহন খরচের চেয়ে অনেক বেশি।’ এসব কারণেই যতটা আশা করা হয়েছিল, ততটা সুবিধা ভারতের বাজারে পণ্য রপ্তানি থেকে বাংলাদেশ পাচ্ছে না বলে মনে করেন মোস্তাফিজুর।

তবু বাণিজ্য ঘাটতি বিরাট রপ্তানি কিছুটা বাড়লেও ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতির ফারাক এখনো বেশ বড়। ২০২০-২১ অর্থবছরে ভারতে পণ্য রপ্তানির তথ্য পাওয়া গেলেও দেশটি থেকে কী পরিমাণ পণ্য আমদানি করা হয়েছে তার পুরো তথ্য এখনও প্রকাশ করেনি দুই দেশের কোনো মন্ত্রণালয় বা বিভাগ।

ফলে চলতি বছর বাণিজ্য ঘাটতি কত, সেটি এখনও জানা যাচ্ছে না। আগের বছর ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাংলাদেশ ভারতে ১০৯ কোটি ৬৩ লাখ ৮০ হাজার ডলারের পণ্য রপ্তানি করে। আর বিপরীতে আমদানি করা হয় ৫৭৯ কোটি ৩৬ লাখ ডলারের পণ্য। এ হিসাবে বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৫৬৮ কোটি ৪০ লাখ ডলার।

২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৭৬৫ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করেছিল বাংলাদেশ। বিপরীতে রপ্তানি করেছিল ১২৫ কোটি ডলারের পণ্য। বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ৬৪০ কোটি ডলার। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ভারত থেকে আমদানির পরিমাণ ছিল ৫৪৫ কোটি ২৯ হাজার ডলার। রপ্তানির অঙ্ক ছিল ৬৯ লাখ ডলার। বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ৪৭৬ কোটি টাকা।

‘নতুন ও বৈচিত্র্যময় পণ্য রপ্তানি করতে হবে’ এক সময় বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির ওপর ভারত কাউন্টার ভেইলিং ডিউটি (সিভিডি) আরোপ করেছিল। ২০১৪ সালে তা প্রত্যাহার করা হয়। এখন পাটজাত পণ্যে ধার্য করা হয়েছে অ্যান্টি ডাম্পিং ডিউটি। ফলে ভারতের বাজারে পণ্য রপ্তানিতে খুব একটা সুবিধা করতে পারছে না বাংলাদেশ।

এ প্রসঙ্গে ইন্দোবাংলা চেম্বার অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আবদুল মাতলুব আহমাদ বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে শুল্ক সুবিধা নেই। সেখানে বাড়তি শুল্ক দিয়ে পণ্য পাঠানো সত্ত্বেও প্রতিবছর আমাদের রপ্তানি বাড়ছে। অথচ ভারতের বাজারে আমরা প্রায় শতভাগ শুল্ক সুবিধা পেয়েও পোশাক রপ্তানি একটা কাউন্টেবল জায়গায় নিতে পারছি না।

‘উল্টো কমানো হচ্ছে পোশাকের দাম। বুঝতে হবে সেখানে চাহিদা সৃষ্টিতে কোথায় আমাদের দুর্বলতা। শুধু পোশাক নয়, সব রপ্তানি পণ্যেরই একই অবস্থা। আর অশুল্ক বাধার কথা নাই-ই বললাম। ‘বর্তমানে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য পুরোপুরি ভারতের অনুকূলে। তবে গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি বেড়েছে প্রায় ৩৭ গুণ। কিন্তু তাতেও ঘাটতি কমেনি।’

মাতলুব আহমাদ বলেন, ‘ভারতে রপ্তানি আশানুরূপ বাড়বে না, যদি আমরা ভারতে বাংলাদেশি পণ্যের চাহিদা তৈরি করতে না পারি। তা করতে হলে সবার আগে দরকার গতানুগতিক বা সমজাতীয় পণ্যের রপ্তানির ধারাবাহিকতা থেকে বেরিয়ে আসা এবং নতুন ও বৈচিত্র্যময় পণ্য সেখানে নিয়ে যাওয়া।’

তিনি বলেন, ‘পণ্যভিত্তিক বাজারের সঠিক পর্যালোচনারও দরকার হবে। যার মাধ্যমে চাহিদা আছে এমন পণ্য রপ্তানির জন্য নির্বাচন করা সম্ভব হবে। এতে স্বাভাবিক নিয়মেই বাড়বে বাজার। কিন্তু এর জন্য নিজেদেরও কিছু কাজ করতে হবে। রপ্তানিকারকদের সক্ষমতা, উৎপাদিত পণ্যের বৈচিত্র্যকরণ ও গুণগত মান বাড়ানোতেও নজর থাকা জরুরি। এতে রপ্তানি পণ্যের ন্যায্য দামও মিলবে।

‘তবে এখন একটা বেশ ভালো পরিবেশ দেখা দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে দু’দেশের সরকারের মধ্যেও বেশ ভালো সম্পর্ক বিরাজ করছে। আমার মনে হয়, আমরা কিছু উদ্যোগ নিলে এখন ভারতে আমাদের রপ্তানি বাড়বে। করোনা না থাকলে গত অর্থবছরে রপ্তানি আরেকটু বাড়ত,’ বলেন বাংলাদেশের ব্যবসায়ী শিল্পপতিদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই সাবেক সভাপতি।

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না.