ডলারের তেজ কমে আসছে, বাড়ছে টাকার মান

0

বিডি২৪ভিউজ ডেস্ক : বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, ‘আমদানি ব্যয় কমায় এবং রপ্তানি আয় ও রেমিট্যান্স বাড়ায় বাজারে ডলারের সরবরাহ বেড়েছে। সে কারণেই ডলারের দাম কমতে শুরু করেছে। এই ধারা ধরে রাখতে পারলে দুই বছর ধরে চলা ডলারের অস্থির বাজারে স্বস্তি ফিরে আসবে। তার ইতিবাচক প্রভাব পড়বে সামগ্রিক অর্থনীতিতেও।’

বাংলাদেশের অর্থনীতিকে গত দুই বছরে অনেকটা ওলোটপালট করে দিয়েছে ডলার। উচ্চ মূল্যের পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রাটির সরবরাহ সংকট প্রভাব ফেলেছে দেশের অর্থনীতির সার্বিক ক্ষেত্রে। তবে আন্তর্জাতিক মুদ্রাটির তেজ কমতে শুরু করেছে। এর বিপরীতে শক্তিশালী হচ্ছে বাংলাদেশি মুদ্রা টাকা।

কয়েক দিন আগেও ১২৪ টাকা পর্যন্ত দরে রেমিট্যান্সের ডলার কিনেছে ব্যাংকগুলো। তারাই এখন প্রতি ডলার ১১৪ টাকা হারে কিনছে। বুধবার আমদানি বিল নিষ্পত্তিতে ডলারের দাম নেয়া হয়েছে ১১৮ থেকে ১১৯ টাকা, যা দুই সপ্তাহ আগেও ছিল ১২২ থেকে ১২৪ টাকা।

খোলা বাজার বা কার্ব মার্কেটেও ডলারের দরে বড় পতন হয়েছে। বুধবার এই বাজারে প্রতি ডলার ১১৮ টাকা ৪০ পয়সায় বিক্রি হয়েছে। মাসখানেক আগেও তা ছিল ১২৬ থেকে ১২৭ টাকা।

সব মিলিয়ে ডলারের বাজারে অস্বস্তি কমে আসছে। এই ধারা ধরে অব্যাহত থাকলে ডলারের ‘অস্থির’ বাজার ‘সুস্থির’ হবে- এমন আশা কথা শুনিয়েছেন অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন।

তবে আন্তঃব্যাংক লেনদেনে ডলারের দর এখনও অনেক কম, ১১০ টাকা। অর্থাৎ এক ব্যাংক আরেক ব্যাংক থেকে ১১০ টাকা দরে ডলার কিনছে। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে বাংলাদেশ ব্যাংক যে ডলার বিক্রি করছে, সোয়াপ কারেন্সির আওতায় টাকা-ডলার অদলবদল করছে সেটাও ১১০ টাকা দরে।

বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, ‘আমদানি ব্যয় কমায় এবং রপ্তানি আয় ও প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স বাড়ায় বাজারে ডলারের সরবরাহ বেড়েছে। সে কারণেই ডলারের দাম কমতে শুরু করেছে। এই ধারা ধরে রাখতে পারলে দুই বছর ধরে চলা ডলারের অস্থির বাজারে স্বস্তি ফিরে আসবে। তার ইতিবাচক প্রভাব পড়বে সামগ্রিক অর্থনীতিতেও।’

২০২২ সালের মার্চ পর্যন্ত প্রায় এক দশক দেশে মুদ্রার বিনিময় দর একটি স্থিতিশীল অবস্থানে ছিল। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো ‌এর সুবিধা পেয়েছে, যার ইতিবাচক প্রভাব সামষ্ট্রিক অর্থনীতিতেও পড়েছে।

করোনা মহামারি কাটিয়ে বিশ্ব অর্থনীতি যখন ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে তখনই এসে লাগে যুদ্ধের ধাক্কা। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বিশ্ববাজারে পণ্য ও কাঁচামালের দাম বেড়ে যায়। এর প্রভাবে ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন ঘটতে থাকে।

কয়েক মাসের মধ্যেই প্রতি ডলারের দাম ৮৫/৮৬ টাকা থেকে বেড়ে ১০০ টাকা ছাড়িয়ে যায়। রপ্তানিকারক, আমদানিকারক এবং রেমিট্যান্স প্রেরকদের মতো বিভিন্ন খাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একাধিক বিনিময় হার বাস্তবায়ন সত্ত্বেও ডলারের বিপরীতে টাকার পতন অব্যাহত থাকে।

২০২৩ সালের শেষ প্রান্তিকে দেশের মুদ্রাবাজারে বিনিময় দরে নজিরবিহীন অস্থিতিশীলতা দেখা দেয়। চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের পর দেশের মুদ্রা বাজারে কিছুটা স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসে। তাতে করে সংশ্লিষ্টরা কিছুটা আত্মবিশ্বাস ফিরে পান। এখন সার্বিকভাবে চাহিদা কমে আসায় অনেক বাণিজ্যিক ব্যাংকই আর চড়া দামে ডলার কিনছে না।

ওদিকে দাম আরও বাড়বে এই আশায় প্রবাসী বাংলাদেশিসহ যারা ডলার সঞ্চয় করে রেখেছিলেন, টাকার মূল্য বাড়তে থাকায় তারাও সেসব ডলার বাজারে ছাড়তে শুরু করেছেন। এমন বাস্তবতায় চাহিদার তুলনায় দেশে ডলার আসছে বেশি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, বুধবার (২০ ফেব্রুয়ারি) দিনের শুরুতে ব্যাংকগুলোতে ডলারসহ অন্যান্য বৈদেশিক মুদ্রার নিট পজিশন ছিল ৩১ কোটি ২০ লাখ ডলার। সেটা বেড়ে বুধবার দিনশেষে ৭৫ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে। এ সময়ে বেশিরভাগ ব্যাংকের কাছে উদ্বৃত্ত ডলার ছিল।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মেজবাউল হক বলেন, ‘ডলার সংকট কাটাতে বিভিন্ন সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নানা পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। সেগুলোরই একটা প্রভাব এখন বাজারে পড়ছে। ব্যাংকগুলোতে ডলারের সরবরাহ বাড়ায় দামও কমছে।’

বিদেশি মুদ্রা লেনদেনকারী ব্যাংকগুলোর সংগঠন বাংলাদেশ ফরেন এক্সচেঞ্জ ডিলার অ্যাসোসিয়েশনের (বাফেদা) চেয়ারম্যান ও সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আফজাল করিম বলেন, ‘অনেকেরই ধারণা ছিল ডলারের দাম আরও বাড়বে। তবে আমরা বলেছিলাম দাম বাড়ার কোনও কারণ নেই। তার প্রতিফলন আমরা ইতোমধ্যে দেখতে পাচ্ছি।

‘আমাদের চাহিদ-জোগানের গ্যাপ কমে আসার কারণে ইনফরমাল মার্কেটেও ডলারের রেট কমে এসেছে। আশা করছি সামনে আরও কমবে। বিষয়টি আমরা পর্যবেক্ষণে রেখেছি।’

ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অফ ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান ও বেসরকারি মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘গত কয়েক মাস ধরে টানা বাড়ছে প্রবাসী আয়। রপ্তানি আয়ে ভালো প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। অন্যদিকে আমদানি ব্যয়ও কমে গেছে। এর প্রভাবে চলতি হিসাবেও উদ্বৃত্ত অবস্থা বজায় রয়েছে। ব্যাংকগুলো এখন এলসি খুলতে আগ্রহ দেখাচ্ছে।’

আপনি এগুলোও দেখতে পারেন

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না.