বিটিআরসি–বিআইজিএফ সম্মেলনে অবিলম্বে জাতীয় এআই নীতিমালা অনুমোদনের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান
নিজস্ব প্রতিনিধি : বাংলাদেশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ব্যবহার, উদ্ভাবন ও সুশাসন নিশ্চিত করতে জাতীয় এআই নীতিমালা অবিলম্বে অনুমোদনের জোরালো আহ্বান জানানো হয়েছে। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) ও বাংলাদেশ ইন্টারনেট গভর্ন্যান্স ফোরামের (বিআইজিএফ) যৌথ উদ্যোগে ১৫–১৭ অক্টোবর ঢাকায় অনুষ্ঠিত তিন দিনব্যাপী সম্মেলনের সমাপনী প্রস্তাবে এ আহ্বান জানিয়ে বলা হয়, এআইয়ের দ্রুত বিকাশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশকে এখনই সুস্পষ্ট, সমন্বিত ও কার্যকর নীতিগত কাঠামো গ্রহণ করতে হবে।

সম্মেলনের মূল প্রতিপাদ্য ছিল: “বুদ্ধিমত্তার যুগে ইন্টারনেট শাসন: অন্তর্ভুক্তিমূলক, নিরাপদ, সহনশীল ও মানবকেন্দ্রিক ডিজিটাল ভবিষ্যৎ”। এতে ডিজিটাল রূপান্তর, উদীয়মান প্রযুক্তি, ইন্টারনেট গভর্ন্যান্স ও প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে ১২টি অধিবেশন ও একটি কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। পাঁচজন আন্তর্জাতিক বক্তাসহ মোট ৮২ জন বক্তা এতে অংশ নেন এবং অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল ৩৫০-এর বেশি। সম্মেলনের আলোচনা ও মতবিনিময়ের মধ্য দিয়ে এআই নীতিমালা অনুমোদনকে বাংলাদেশের নিরাপদ, ন্যায়সংগত ও উদ্ভাবনবান্ধব ডিজিটাল ভবিষ্যতের অন্যতম জরুরি ভিত্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
সম্মেলনে আলোচনার প্রধান বিষয়গুলো ছিল: এআই নীতি ও কৌশল, মানবকেন্দ্রিক শাসন, ডেটা সুরক্ষা ও আস্থা, সাইবার নিরাপত্তা ও ডিজিটাল সহনশীলতা, ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি ও সক্ষমতা উন্নয়ন, ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার ও আন্তঃকার্যক্ষমতা, টেকসই উন্নয়ন ও ডিজিটাল গণতন্ত্র, আইন, মানবাধিকার ও জনস্বার্থ।
বক্তারা প্রযুক্তিগত অগ্রগতির পাশাপাশি নাগরিক অধিকার, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, জনস্বার্থ এবং ডিজিটাল বৈষম্য হ্রাসের ওপর জোর দেন। তাঁরা বলেন, এআই প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি। এ কাঠামোতে মানবাধিকার সুরক্ষা, অ্যালগরিদমিক স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, বৈষম্য প্রতিরোধ, ডেটা সুরক্ষা এবং নিরাপদ উদ্ভাবনের বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে।
সম্মেলনে নীতিনির্ধারক, শিক্ষাবিদ, গবেষক, প্রযুক্তিবিশেষজ্ঞ, শিল্প খাতের প্রতিনিধি এবং ইন্টারনেট গভর্ন্যান্স সংশ্লিষ্ট অংশীজনেরা অংশ নেন। তাঁদের সম্মিলিত সুপারিশ ছিল—জাতীয় এআই নীতিমালা দ্রুত অনুমোদনের পাশাপাশি এর বাস্তবায়নে সুস্পষ্ট দায়িত্ব বণ্টন, কার্যকর নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা, নিয়মিত পর্যালোচনা এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব নিশ্চিত করতে হবে। অংশীজনদের মতে, সময়োপযোগী জাতীয় এআই নীতিমালা দায়িত্বশীল ও নৈতিক ব্যবহার, গবেষণা ও উদ্ভাবন, বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের জন্য পূর্বানুমেয় ও আস্থাশীল পরিবেশ তৈরি করবে।
একই সঙ্গে অন্তর্ভুক্তিমূলক ডিজিটাল অবকাঠামো, অর্থবহ সংযোগ এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এআইয়ের সুফল সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। বিশেষ করে নারী, শিশু, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এবং প্রযুক্তিতে পিছিয়ে থাকা অঞ্চলের মানুষের জন্য সহজলভ্যতা ও সক্ষমতা উন্নয়নকে নীতিমালার গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনার সুপারিশ করা হয়।
সম্মেলনের সমাপনী প্রস্তাবে আরও বলা হয়, এআই ব্যবহারে জনআস্থা গড়ে তুলতে তথ্যের নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, সাইবার নিরাপত্তা এবং ক্ষতিকর বা বৈষম্যমূলক ব্যবহারের বিরুদ্ধে কার্যকর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি বাংলা ভাষা ও স্থানীয় বাস্তবতার উপযোগী এআই গবেষণা, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ, এবং সরকারি সেবায় দায়িত্বশীল এআই ব্যবহারে বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানানো হয়।
আয়োজকদের মতে, সম্মেলনটি বাংলাদেশের ডিজিটাল ভবিষ্যৎ নিয়ে অংশীজনদের সংলাপকে আরও গভীর ও কার্যকর করেছে এবং নিরাপদ, সহনশীল, টেকসই ও মানবকেন্দ্রিক ডিজিটাল উন্নয়নে সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট করেছে। সম্মেলনে উত্থাপিত প্রস্তাব ও সুপারিশ বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়নকে আরও জবাবদিহিমূলক, ন্যায়সংগত ও জনকল্যাণমুখী করা সম্ভব হবে।
বিটিআরসি ও বিআইজিএফ জাতীয় এআই নীতিমালা দ্রুত অনুমোদন, অংশীজনদের ধারাবাহিক পরামর্শ গ্রহণ এবং সম্মেলনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সক্রিয় সহযোগিতা কামনা করেছে। তাঁদের প্রত্যাশা, সমন্বিত ও অংশগ্রহণমূলক উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশ এমন একটি এআই পরিবেশ গড়ে তুলবে, যা উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করবে, নাগরিক অধিকার সুরক্ষিত রাখবে এবং দেশের টেকসই উন্নয়নে কার্যকর অবদান রাখবে।
অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী পর্বে সবাইকে স্বাগত জানান বিআইজিএফ-এর সেক্রেটারি জেনারেল, মোহাম্মদ আব্দুল হক অনু। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. এমদাদ উল বারী (অব.)। সম্মানিত অতিথি হিসেবে অনলাইনে যুক্ত হন জাতিসংঘের ইন্টারনেট গভর্ন্যান্স ফোরাম সচিবালয়ের ডিজিটাল নীতি ও নিয়ন্ত্রণবিষয়ক বিশেষজ্ঞ আনজা গেঙ্গো।
উদ্বোধনী পর্বে জাতিসংঘের তথ্যসমাজবিষয়ক গ্রুপের মাল্টি-স্টেকহোল্ডার কনসালটেশন গ্রুপের সদস্য ও রেসপনসিবল আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স অ্যাম্বাসেডর এ এইচ এম বজলুর রহমান বলেন, ইন্টারনেটে সাইবার হামলা, ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার, বিভ্রান্তিকর তথ্য এবং প্রযুক্তির সহায়তায় জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার ঝুঁকি অনেক বেড়েছে। মানুষের অধিকার, নিরাপত্তা এবং মর্যাদাকে ডিজিটাল নীতির কেন্দ্রে রেখে প্রযুক্তির ক্ষতি হলে কার্যকরি প্রতিকার নিশ্চিত করা দরকার। বৈশ্বিক ইন্টারনেট গভর্ন্যান্সের আলোচনাকে বাংলাদেশের বাস্তবতার সঙ্গে সংযুক্ত করে বহুমুখী সংলাপ গড়ে তোলা জরুরি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে বিটিআরসির সিস্টেমস অ্যান্ড সার্ভিসেস বিভাগের সাবেক মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ খলিল উর রহমান (অব.) ডিজিটাল বৈষম্যের পরিবর্তনশীল বলে উল্লেখ করেন। বলেন, একসময় ইন্টারনেট সংযোগের আওতা বাড়ানোই ছিল প্রধান লক্ষ্য। তবে এখন সংযোগের পাশাপাশি ব্যবহার, ডিজিটাল দক্ষতা, নেটওয়ার্কের মান এবং প্রযুক্তি থেকে সুফল পাওয়ার সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় নেটওয়ার্ক পৌঁছালেও সবাই সমানভাবে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারছেন না বলে জানান তিনি।
নতুন অংশগ্রহণকারীদের জন্য ইন্টারনেট গভর্ন্যান্স ও বিভিন্ন ফেলোশিপের সুযোগ নিয়ে একটি বিশেষ অধিবেশনও অনুষ্ঠিত হয়। এতে ইন্টারনেট গভর্ন্যান্স বিষয়ে তরুণদের অংশগ্রহণ এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যুক্ত হওয়ার সুযোগ নিয়ে আলোচনা করা হয়।
দ্বিতীয় দিনের অধিবেশনে ‘এআই পলিসি অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজি, এমার্জিং টেকনোলজিস অ্যান্ড হিউম্যান-সেন্ট্রিক গভর্ন্যান্স’ এ গাজীপুরের যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ এবং অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. আসাদুজ্জামান।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোবোটিক্স অ্যান্ড মেকাট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. লাফিফা জামাল ‘প্রযুক্তির মাধ্যমে এআইয়ের যুগে জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধ’ বিষয়ে মূল বক্তব্য দেন। নারী সহিংসতা নিয়ে বিভিন্ন পরিসংখ্যান তুলে ধরেন তিনি৷ প্রযুক্তির ব্যবহারে নিজেদের অসচেতনতায় ব্যক্তিগত তথ্য এআইকে দিয়ে দেয়া এবং একই ফোন একাধিক মানুষের ব্যবহার, প্রযুক্তি সম্পর্কে অজ্ঞতাসহ নানা কারণে নারীদের অনলাইন ব্যবহারে ঝুঁকির কথা বলেন তিনি।
অনুষ্ঠানে প্রযুক্তিনির্ভর লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার ঝুঁকি নিয়ে বক্তব্য দেন বিএনএনআরসির প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর হীরেন পন্ডিত। তরুণদের ক্ষমতায়ন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে তাদের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে বক্তব্য দেন নাগরিকতা: সিভিক এনগেজমেন্ট ফান্ড (সিইএফ) সক্ষমতা উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ মো. নুরুল ইসলাম। এ সময় তরুণদের ডিজিটাল দক্ষতা বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ব্যবহারের গুরুত্ব তুলে ধরেন তিনি।
সংসদ সদস্য নিলুফার চৌধুরী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে অনলাইন হয়রানির প্রসঙ্গ তুলে ধরে গত কয়েক বছরে নিজের এমন অভিজ্ঞতার কথাও জানান। তিনি ডিজিটাল দক্ষতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ব্যবহার এবং সংশ্লিষ্ট সবার জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন।
তৃতীয় দিনের কর্মসূচিতে শিশু ও তরুণদের এআই ব্যবহারে সচেতন করতে ইয়ুথ লিডারদের নিয়ে অধিবেশন করে বিআইজিএফ।