ওপারে ভালো থাকুন, প্রিয় রঞ্জনদা

শ্রদ্ধাঞ্জলি

0

হীরেন পণ্ডিত : কিছু মানুষের মৃত্যু কেবল একটি জীবনের অবসান নয়; একটি সময়, একটি আন্দোলন এবং বহু মানুষের আশ্রয় হারানোর বেদনাও। রঞ্জন কর্মকার তেমনই একজন মানুষ। তিনি চলে যাওয়ার পর বাংলাদেশের নাগরিক সমাজে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা কোনো একটি সংগঠন, পদ কিংবা পরিচয় দিয়ে পরিমাপ করা সম্ভব নয়। কারণ, তিনি একই সঙ্গে ছিলেন মানবাধিকারকর্মী, নারী অধিকার আন্দোলনের সহযোদ্ধা, উন্নয়নচিন্তক, অসাম্প্রদায়িক সমাজের প্রবক্তা, দক্ষ সংগঠক এবং প্রজন্মের পর প্রজন্মকে যুক্ত করে রাখার এক অসাধারণ সেতুবন্ধ।

১২ আগস্ট ২০২৬ বুধবার সকালে ঢাকার বিআরবি হাসপাতালে হৃদ্‌যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে রঞ্জন কর্মকার পরলোকগমন করেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৭২ বছর। তিনি স্ত্রী এবং কানাডাপ্রবাসী একমাত্র ছেলেকে রেখে গেছেন। তাঁর পৈতৃক নিবাস ছিল ঝালকাঠির কীর্তিপাশায়।

মৃত্যু সব সময়ই বেদনাদায়ক। কিন্তু রঞ্জনদার মৃত্যু যেন একটি প্রশ্ন রেখে গেছে: কিসের এত তাড়া ছিল তাঁর? নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম এখনো অসমাপ্ত। সিডও সনদের পূর্ণ বাস্তবায়ন এখনো হয়নি। ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা এখনো নিশ্চিত নয়। সড়কে মানুষের মৃত্যুর মিছিলও থামেনি। নাগরিক সমাজের পরিসর ক্রমে সংকুচিত হচ্ছে। সুবিধাবঞ্চিত মানুষের মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার কাজও শেষ হয়নি। অথচ এসব অসমাপ্ত লড়াইয়ের মধ্যেই তিনি চলে গেলেন।
তাঁর চলে যাওয়া আমাদের কাঁদায়। একই সঙ্গে তাঁর জীবন আমাদের সামনে একটি দায়িত্বও রেখে যায়।
জগন্নাথ হল থেকে জাতীয় পরিসরে
রঞ্জন কর্মকারের সাংগঠনিক জীবনের ভিত্তি নির্মিত হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ছাত্রজীবনে তিনি বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮১-৮২ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক বা জিএস নির্বাচিত হন।
কিন্তু তাঁর জনপ্রিয়তা কেবল দলীয় পরিচয়ের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল না। ব্যক্তিগতভাবে তিনি একটি নির্দিষ্ট প্রগতিশীল রাজনৈতিক ধারার সঙ্গে যুক্ত থাকলেও ভিন্ন দল, মত ও বিশ্বাসের মানুষের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল আন্তরিক। জগন্নাথ হলে আসার অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি বহু শিক্ষার্থীর আস্থা অর্জন করেছিলেন। তাঁর গ্রহণযোগ্যতার মূল কারণ ছিল মানুষের কথা মন দিয়ে শোনা, বিরোধের মধ্যেও সম্পর্ক অক্ষুণ্ন রাখা এবং সংকটে মানুষের পাশে দাঁড়ানো।
নির্বাচিত ছাত্রনেতা হওয়া তাঁর কাছে ক্ষমতার কোনো সিঁড়ি ছিল না। এটি ছিল মানুষের সেবা করার একটি মাধ্যম। বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতিতে যখন মতভেদ প্রায়ই ব্যক্তিগত শত্রুতায় পরিণত হয়, তখন রঞ্জন কর্মকার দেখিয়েছিলেন, আদর্শে দৃঢ় থেকেও ভিন্নমতের মানুষের সঙ্গে সম্মানজনক সম্পর্ক বজায় রাখা সম্ভব।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক পাঠ শেষ হলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং জগন্নাথ হলের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কখনো শেষ হয়নি। ২০০৯ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত তিনি জগন্নাথ হল অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের নেতৃত্বে দায়িত্ব পালন করেন। পরে ২০১৬ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত দুই মেয়াদে ঢাকা ইউনিভার্সিটি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব ছিলেন। অ্যালামনাই সংগঠন তাঁর কাছে শুধু পুরোনো বন্ধুদের পুনর্মিলনের জায়গা ছিল না। তিনি একে দেখতেন প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতা, সামর্থ্য ও সামাজিক দায়বদ্ধতাকে বৃহত্তর মানুষের কল্যাণে যুক্ত করার একটি ক্ষেত্র হিসেবে। দেশে ও প্রবাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মধ্যে সম্পর্ক তৈরিতে তাঁর ভূমিকা ছিল গভীর। ঢাকা ইউনিভার্সিটি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন যুক্তরাজ্য শাখার শতবর্ষ উদ্‌যাপনেও তাঁর উপস্থিতি ও সহযোগিতা প্রবাসী অ্যালামনাইদের স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে আছে।

উন্নয়নকে মানুষের অধিকার হিসেবে দেখা
ছাত্রজীবনের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা রঞ্জন কর্মকারকে মানুষের বঞ্চনা খুব কাছ থেকে দেখতে শিখিয়েছিল। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, রাজনৈতিক স্বাধীনতা গুরুত্বপূর্ণ হলেও শুধু সেটি দিয়ে মানুষের জীবন বদলে যায় না। প্রয়োজন সামাজিক ন্যায়বিচার, বৈষম্যহীনতা, সম্পদ ও সুযোগে প্রবেশাধিকার এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে পিছিয়ে পড়া মানুষের অংশগ্রহণ।
এই উপলব্ধি থেকেই তিনি স্টেপস টুয়ার্ডস ডেভেলপমেন্টের সঙ্গে দীর্ঘ কর্মজীবন গড়ে তোলেন এবং প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে তাঁর কাজের কেন্দ্রে ছিল অধিকারভিত্তিক উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়ন, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ন্যায়ভিত্তিক সমাজ নির্মাণ।
রঞ্জনদার উন্নয়নদর্শনের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য ছিল, তিনি দরিদ্র কিংবা প্রান্তিক মানুষকে করুণার পাত্র হিসেবে দেখতেন না। তাঁদের তিনি দেখতেন অধিকারসম্পন্ন নাগরিক হিসেবে। এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দান মানুষকে সাময়িক সহায়তা করতে পারে, কিন্তু অধিকার মানুষকে নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা দেয়। তাঁর কাজে তাই সহায়তার পাশাপাশি সংগঠন গড়ে তোলা, নেতৃত্ব তৈরি, অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে মানুষের কণ্ঠ পৌঁছে দেওয়ার ওপর গুরুত্ব ছিল।
বাংলাদেশের উন্নয়ন খাতে অনেক প্রকল্প আসে এবং শেষ হয়ে যায়। প্রতিবেদন জমা পড়ে, সূচক পূরণ হয়, কিন্তু মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক টিকে থাকে না। রঞ্জন কর্মকারের কাজের পদ্ধতি ছিল ভিন্ন। তিনি প্রকল্পের চেয়ে প্রক্রিয়াকে, প্রদর্শনের চেয়ে অংশগ্রহণকে এবং সংখ্যার চেয়ে মানুষের মর্যাদাকে বেশি গুরুত্ব দিতেন। তাঁর কাছে উন্নয়ন কোনো প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা ছিল না; এটি ছিল ক্ষমতা, বৈষম্য ও ন্যায়বিচারের প্রশ্ন।
নারী আন্দোলনের একজন নির্ভরযোগ্য পুরুষ সহযোদ্ধা
রঞ্জন কর্মকারের কর্মজীবনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়গুলোর একটি ছিল বাংলাদেশের নারী অধিকার ও জেন্ডার ন্যায়বিচার আন্দোলনে তাঁর দীর্ঘ সম্পৃক্ততা। তিনি এমন এক সময়ে এ আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিলেন, যখন নারীর অধিকারকে অনেক ক্ষেত্রেই শুধু নারীদের বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হতো। রঞ্জনদা বুঝেছিলেন, পিতৃতান্ত্রিক বৈষম্যের অবসান ঘটাতে হলে পুরুষদেরও নিজেদের ভূমিকা, আচরণ ও প্রাপ্ত সুবিধা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে হবে।
তিনি নারী আন্দোলনের নেতৃত্ব দখল করতে চাননি; বরং আন্দোলনের পাশে দাঁড়িয়েছেন একজন দায়বদ্ধ সহযোগী হিসেবে। এই অবস্থান তাঁকে অন্যদের থেকে স্বতন্ত্র করেছে। নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে বক্তব্য দেওয়া সহজ, কিন্তু পরিবার, প্রতিষ্ঠান, রাজনীতি এবং সামাজিক আচরণের মধ্যে পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতার কাঠামোকে প্রশ্ন করা কঠিন। রঞ্জনদা সেই কঠিন কাজটি বেছে নিয়েছিলেন।
সিডও বা নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ সনদের পূর্ণ বাস্তবায়নের দাবিতে তিনি দীর্ঘদিন সক্রিয় ছিলেন। Citizens’ Initiatives on CEDAW–Bangladesh-এর কার্যক্রমে তাঁর অংশগ্রহণ ছিল দৃশ্যমান। বাংলাদেশের সংরক্ষণ প্রত্যাহার এবং সনদের বিধানগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের দাবিতে তিনি অন্য নারী ও মানবাধিকার নেতাদের সঙ্গে কথা বলেছেন। ২০০৭ সালে সিডও কমিটির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনায় এবং ২০০৯ সালে সিডওর ধারাগুলোর ওপর বাংলাদেশের সংরক্ষণ প্রত্যাহারের দাবিতে তাঁর স্বতস্ফূর্ত অংশগ্রহণ।
এই সম্পৃক্ততা নিছক অনুষ্ঠাননির্ভর ছিল না। তিনি জানতেন, আন্তর্জাতিক সনদে স্বাক্ষর করলেই নারীর জীবন বদলে যায় না। সনদের নীতিকে জাতীয় আইন, সরকারি নীতি, বাজেট, বিচারপ্রক্রিয়া, স্থানীয় সরকার এবং সামাজিক আচরণে রূপান্তর করতে হয়। সে জন্য প্রয়োজন ধারাবাহিক জনমত সৃষ্টি, নীতি-সংলাপ এবং সরকারের জবাবদিহি।
নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ, বাল্যবিবাহ বন্ধ, নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, স্থানীয় সরকারে নারী প্রতিনিধিদের কার্যকর ক্ষমতায়ন এবং নারীর অবৈতনিক গৃহস্থালি কাজের স্বীকৃতির মতো বিষয়েও তিনি সোচ্চার ছিলেন। নারী নেতৃত্ব সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সুস্পষ্ট: শুধু সংরক্ষিত আসন কিংবা প্রতীকী উপস্থিতি দিয়ে ক্ষমতায়ন হয় না; নারীর স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা, সম্পদে প্রবেশাধিকার এবং সাধারণ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
একটি নীতি গবেষণায় তিনি নারীনেতৃত্বকে অন্তর্ভুক্তিমূলক, বৈচিত্র্যবান্ধব ও বৈষম্যবিরোধী ভিত্তিতে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। স্থানীয় পর্যায়ের নারী জনপ্রতিনিধিদের জন্য সমন্বিত সক্ষমতা উন্নয়ন, আইন সম্পর্কে জ্ঞান, গণমাধ্যম ও প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা এবং রাজনৈতিক দলের সাধারণ আসনে নারীর মনোনয়ন বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি তুলে ধরেছিলেন।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের নেতৃত্বাধীন সামাজিক প্রতিরোধ কমিটির কর্মসূচিতেও তিনি পরিচিত মুখ ছিলেন। নারী ও কন্যাশিশুর ওপর সহিংসতা, যৌন হয়রানি, বাল্যবিবাহ এবং সাম্প্রদায়িক আক্রমণের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা এই যৌথ নাগরিক প্ল্যাটফর্মে তাঁর উপস্থিতি প্রমাণ করে, তিনি নারী অধিকারকে বিচ্ছিন্ন কোনো খাত হিসেবে দেখতেন না। তাঁর কাছে নারী অধিকার, মানবাধিকার, গণতন্ত্র এবং অসাম্প্রদায়িকতা ছিল একই ন্যায়বিচারের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ নির্মাণের সংগ্রাম
রঞ্জন কর্মকার ছিলেন বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য। বাংলাদেশ পূজা উদ্‌যাপন পরিষদের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু তাঁর অসাম্প্রদায়িকতার ধারণা কেবল কোনো একটি ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না।
তিনি বিশ্বাস করতেন, রাষ্ট্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ কিংবা সংখ্যালঘু পরিচয়ের ভিত্তিতে কোনো নাগরিকের মর্যাদা নির্ধারিত হতে পারে না। ধর্মীয় পরিচয় ব্যক্তির অধিকারকে সংকুচিত করবে না, আবার কোনো সম্প্রদায়ের ওপর সংঘটিত সহিংসতাকে রাজনৈতিক সুবিধার জন্য উপেক্ষাও করা যাবে না। সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ, উপাসনালয় ভাঙচুর, ভূমি দখল এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান ছিল দৃঢ়।
তবে তাঁর অসাম্প্রদায়িকতা ছিল সম্পর্কনির্ভর। তিনি ভিন্ন ধর্ম, রাজনৈতিক দল ও মতাদর্শের মানুষের সঙ্গে কথা বলতে পারতেন। কারণ, তাঁর কাছে অসাম্প্রদায়িকতা কোনো স্লোগান ছিল না; এটি ছিল প্রতিদিনের আচরণ। তিনি জানতেন, ঘৃণার রাজনীতির বিরুদ্ধে শুধু বিবৃতি যথেষ্ট নয়। মানুষের মধ্যে আস্থা, সংলাপ এবং সহযোগিতার জায়গা তৈরি করতে হয়।
এই কারণেই তাঁর মৃত্যুতে শুধু একটি সম্প্রদায় নয়, বিভিন্ন ধর্ম, মত ও পেশার মানুষ শোক প্রকাশ করেছেন। এটিই তাঁর জীবনের সবচেয়ে শক্তিশালী স্বীকৃতিগুলোর একটি।

মানবাধিকার ও নিরাপদ নাগরিক পরিসর
রঞ্জন কর্মকার বাংলাদেশের মানবাধিকার আন্দোলনেরও একজন পরিচিত ও বিশ্বস্ত সংগঠক ছিলেন। তিনি হিউম্যান রাইটস ফোরাম বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। Safeguarding Resource and Support Hub তাঁকে একজন সম্মানিত মানবাধিকার রক্ষক এবং বাংলাদেশের নারী আন্দোলন ও জেন্ডার সমতায় আজীবন অবদান রাখা ব্যক্তি হিসেবে মনে করে। তিনি ওই প্রতিষ্ঠানের বাংলাদেশ ন্যাশনাল এক্সপার্ট বোর্ডের সদস্যও ছিলেন।
মানবাধিকার নিয়ে তাঁর কাজের একটি বড় শক্তি ছিল বিভিন্ন আন্দোলন ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সংযোগ তৈরি করা। নারী সংগঠন, আইন ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সংস্থা, সাংস্কৃতিক আন্দোলন এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের তিনি এক জায়গায় আনতে পারতেন। বর্তমান সময়ে যখন নাগরিক সমাজের বিভিন্ন অংশ অনেক সময় নিজ নিজ বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, তখন তাঁর এই সেতুবন্ধনের ক্ষমতা বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।
মানবাধিকার রক্ষা তাঁর কাছে শুধু কোনো লঙ্ঘনের পর প্রতিবাদ করার বিষয় ছিল না। মানুষের সংগঠিত হওয়ার স্বাধীনতা, ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ, নাগরিক প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা এবং নিরাপদ জনপরিসর রক্ষা করাও মানবাধিকারের অংশ। তিনি প্রতিষ্ঠান গড়েছেন, জোট তৈরি করেছেন এবং নীরবে বহু মানুষ ও সংগঠনকে এগিয়ে যেতে সহায়তা করেছেন।
সড়ক নিরাপত্তা: বেঁচে থাকার অধিকার
রঞ্জন কর্মকার বাংলাদেশ রোড সেফটি কোয়ালিশনের অন্যতম সক্রিয় সদস্য ছিলেন। সড়ক দুর্ঘটনাকে তিনি কেবল পরিবহন ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা হিসেবে দেখতেন না; দেখতেন মানুষের জীবন ও নিরাপত্তার অধিকারের প্রশ্ন হিসেবে।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতেও তিনি অন্য নাগরিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি একটি কার্যকর সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেন। জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত তিনি জনস্বার্থের এই আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন।
বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার আলোচনা প্রায়ই চালকের ভুল কিংবা পথচারীর অসতর্কতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়। কিন্তু নিরাপদ সড়কের জন্য প্রয়োজন বিজ্ঞানভিত্তিক আইন, কার্যকর প্রয়োগ, নিরাপদ অবকাঠামো, যানবাহনের মান নিয়ন্ত্রণ, গতিসীমা ব্যবস্থাপনা এবং দুর্ঘটনার নির্ভরযোগ্য তথ্য। রঞ্জনদা এই বৃহত্তর প্রাতিষ্ঠানিক দায়ের কথাই সামনে আনতে চেয়েছেন।
তাঁর এই কাজ মনে করিয়ে দেয়, বেঁচে থাকার অধিকার শুধু সহিংসতা বা নির্যাতন থেকে সুরক্ষার বিষয় নয়। প্রতিদিন ঘর থেকে বেরিয়ে নিরাপদে ফিরে আসার নিশ্চয়তাও রাষ্ট্রের মানবাধিকারগত দায়িত্ব।
পদ নয়, মানুষই ছিল তাঁর পরিচয়
রঞ্জন কর্মকারের পরিচয়ের পাশে বহু পদ লেখা যায়। নির্বাহী পরিচালক, মহাসচিব, জিএস, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য, উপদেষ্টা কিংবা মানবাধিকারকর্মী। কিন্তু যাঁরা তাঁর সঙ্গে কাছ থেকে কাজ করেছেন, তাঁদের কাছে তিনি ছিলেন ‘রঞ্জনদা’। আমার সাথে ১৯৯৬ সাল থেকে দাদার সাথে পরিচয়, ঘনিষ্ঠতা ও স্নেহ লাভের সুযোগ পেয়েছি। এই ‘দাদা’ সম্বোধনের মধ্যে ছিল শ্রদ্ধা, নির্ভরতা ও ভালোবাসা। তিনি মানুষকে আপন করে নিতে পারতেন। বয়স, পদমর্যাদা কিংবা রাজনৈতিক অবস্থানের পার্থক্য তাঁর সম্পর্ক তৈরিতে দেয়াল হয়ে দাঁড়াত না। কোনো নবীন কর্মীর কথা তিনি মন দিয়ে শুনতেন, আবার জাতীয় পর্যায়ের নেতাদের সামনে স্পষ্টভাবে নিজের বক্তব্য তুলে ধরতেন।
তাঁর নেতৃত্ব ছিল উচ্চকণ্ঠ নয়, সংযোগ সৃষ্টিকারী। তিনি আলোচনার কেন্দ্রে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার চেয়ে সবাইকে আলোচনায় যুক্ত করতে বেশি আগ্রহী ছিলেন। নেতৃত্বের এই ধরন এখন বিরল। আমাদের জনপরিসরে অনেক নেতা অনুসারী চান, কিন্তু সহকর্মী তৈরি করতে পারেন না। রঞ্জনদা সহকর্মী, বন্ধু এবং নতুন নেতৃত্ব তৈরি করেছেন।
তিনি সংগঠনকে নিজের ব্যক্তিগত সম্পত্তি মনে করেননি। বরং প্রতিষ্ঠানকে মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ হিসেবে দেখেছেন। এ কারণেই তাঁর অনুপস্থিতি এত গভীরভাবে অনুভূত হচ্ছে। তিনি পদে ছিলেন বলে নয়, মানুষ ও প্রতিষ্ঠানকে ধরে রাখতেন বলে।
তাঁকে স্মরণ করার অর্থ
শোকসভা হবে, স্মরণসভা হবে, তাঁর ছবির সামনে ফুল রাখা হবে। কিন্তু রঞ্জন কর্মকারকে সত্যিকার অর্থে স্মরণ করতে হলে তাঁর অসমাপ্ত কাজগুলোর দিকে তাকাতে হবে। তাঁকে স্মরণ করার অর্থ হলো সিডও সনদের পূর্ণ বাস্তবায়নের দাবি জোরদার করা। নারীর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে রাষ্ট্র ও সমাজকে জবাবদিহির মধ্যে আনা। নারীকে উন্নয়নের সুবিধাভোগী নয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। তাঁকে স্মরণ করার অর্থ হলো ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তাকে কোনো সাময়িক রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে না দেখা। প্রত্যেক নাগরিকের সমান মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর করা।
তাঁকে স্মরণ করার অর্থ হলো সড়কে প্রতিটি প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যুকে নিছক ‘দুর্ঘটনা’ বলে মেনে না নেওয়া। নিরাপদ সড়ককে নাগরিক অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠার আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া। তাঁকে স্মরণ করার অর্থ হলো উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রকল্পের হিসাবের বাইরে গিয়ে মানুষের মর্যাদা, অংশগ্রহণ ও অধিকারকে অগ্রাধিকার দেওয়া। নাগরিক সমাজের বিভিন্ন আন্দোলনের মধ্যে আবার সংযোগ সৃষ্টি করা।
এবং তাঁকে স্মরণ করার অর্থ হলো ভিন্নমতের মানুষের সঙ্গে কথা বলার সংস্কৃতি পুনর্গঠন করা। আদর্শে অবিচল থেকেও সম্পর্কের দরজা বন্ধ না করা। কারণ, রঞ্জনদার জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, গভীর রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তন একা ঘটানো যায় না; তার জন্য মানুষকে সঙ্গে নিতে হয়।
ওপারে ভালো থাকুন
রঞ্জনদা, আপনার চলে যাওয়ার সময়টি বড় অসময়। আপনি যখন চলে গেলেন, তখন দেশকে আরও বেশি সংলাপ, সহমর্মিতা ও ন্যায়বিচার শেখানো প্রয়োজন ছিল। নাগরিক সমাজের মধ্যে আরও বেশি সেতু নির্মাণের প্রয়োজন ছিল। নারী অধিকার, মানবাধিকার, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং নিরাপদ সড়কের আন্দোলনে আপনার মতো নির্ভরযোগ্য সহযোদ্ধার প্রয়োজন ছিল। আপনার ব্যবহৃত চেয়ারটি হয়তো অন্য কেউ গ্রহণ করবেন। আপনার পদগুলোতেও নতুন মানুষ আসবেন। সংগঠনের সভা চলবে, প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে, প্রতিবেদন প্রকাশিত হবে। কিন্তু মানুষের মধ্যে আস্থা তৈরি করার যে বিরল ক্ষমতা আপনার ছিল, সেই জায়গাটি পূরণ করা সহজ হবে না। আপনি আমাদের শিখিয়েছেন, রাজনীতি মানে শুধু ক্ষমতা নয়, মানুষের পাশে দাঁড়ানো। উন্নয়ন মানে শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নয়, মানুষের অধিকার ও মর্যাদা। নারী অধিকার শুধু নারীর লড়াই নয়, ন্যায়বিচারে বিশ্বাসী প্রত্যেক মানুষের দায়িত্ব। অসাম্প্রদায়িকতা শুধু সংবিধানের শব্দ নয়, প্রতিদিনের সম্পর্ক ও আচরণের পরীক্ষা। আর নেতৃত্ব মানে সামনে দাঁড়িয়ে নির্দেশ দেওয়া নয়, সবাইকে সঙ্গে নিয়ে পথ তৈরি করা।
এ দেশের নারী অধিকার আন্দোলন আপনাকে মনে রাখবে। সিডও বাস্তবায়নের সংগ্রামের সহযোদ্ধারা আপনাকে মনে রাখবেন। সুবিধাবঞ্চিত মানুষ, মানবাধিকারকর্মী, সড়ক নিরাপত্তা আন্দোলনের সাথি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জগন্নাথ হলের অসংখ্য প্রাক্তন শিক্ষার্থী আপনাকে মনে রাখবেন।
আপনার স্ত্রী, সন্তান, পরিবার ও স্বজনদের শোক কোনো ভাষায় লাঘব করা সম্ভব নয়। তাঁদের প্রতি আমাদের গভীর সমবেদনা। তবে তাঁরা এই সান্ত্বনা পেতে পারেন যে রঞ্জন কর্মকারের জীবন কেবল তাঁর নিজের ছিল না। তাঁর জীবন ছড়িয়ে আছে অসংখ্য মানুষের স্মৃতি, সাহস এবং ভালোবাসার মধ্যে। মানুষ চলে যায়, কিন্তু তাঁর বেছে নেওয়া মূল্যবোধ চলে যায় না। প্রতিষ্ঠান বদলায়, সময় বদলায়, আন্দোলনের ভাষাও বদলায়; কিন্তু ন্যায়বিচার, সমতা ও মানবিক মর্যাদার প্রয়োজন কখনো শেষ হয় না। রঞ্জনদা, আপনার কাজ অসমাপ্ত। সেই কাজ এখন আমাদের এগিয়ে নিতে হবে। ওপারে ভালো থাকুন, প্রিয় রঞ্জনদা। আপনার স্মৃতি ও অবদান আমাদের হৃদয়ে এবং বাংলাদেশের মানবাধিকার ও সামাজিক ন্যায়বিচারের আন্দোলনে চিরদিন বেঁচে থাকবে।

হীরেন পণ্ডিত, প্রাবন্ধিক ও গবেষক

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না.