রোড ক্রাশ বা সড়ক দুর্ঘটনার আচরণগত ঝুঁকি নিরসনে করণীয় নির্ধারণে ঢাকা মেট্র্রোপলিটন পুলিশের মতবিনিময় সভা
নিজস্ব প্রতিনিধি : সড়ক দুর্ঘটনার আচরণগত ঝুঁকিসমূহ দেশের বিদ্যমান আইন ও বিধিমালার আলোকে করণীয় বিষয়ে গত ০৪ অক্টোবর ২০২৬ খ্রি. তারিখে ঢাকা মেট্র্রোপলিটান পুলিশ সদর দপ্তরে একটি মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
ঢাকাসহ সারাদেশে সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জাতীয় পর্যায়ে সড়ক দুর্ঘটনা বা রোড ক্রাশের একক তথ্যভান্ডার তৈরি এবং আচরণগত ঝুঁকি কমানোর মাধ্যমে সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে করণীয় নির্ধারণ বিষয়ে গ্লোবাল রোড সেফটি পার্টনারশীপ (জিআরএসপি) এর আর্থিক সহযোগিতায় বেসরকারি স্বাস্থ্যবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ বাংলাদেশ (সিআইপিআরবি) এই মতবিনিময় সভাটি আয়োজন করে।
সভায় ব্লমবার্গ ফিলানথ্রপিস ইনিশিয়েটিভ ফর গ্লোবাল রোড সেফটি (বিআইজিআরএস) এর ইনিশিয়েটিভ কো-অর্ডিনেটর জনাব মো: ওয়াদুদ, ঢাকা মেট্র্রোপলিটান পুলিশের ৮ জোনের ডেপুটি কমিশনারগণ, এবং পরিবেশ অধিদপ্তর ও রোড সেফটি কোয়ালিশন বাংলাদেশ এর ৫টি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিবৃন্দ অংশগ্রহণ করেন।
এই মতবিনিময় সভায় সভাপতি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা মেট্র্রোপলিটান পুলিশ এর অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) জনাব মোঃ আনিছুর রহমান। তিনি সড়ক দুর্ঘটনার পরিসংখ্যানগত তারতম্যের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন পাশাপাশি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ও আহতদের তথ্য যথাযথভাবে সংরক্ষণের জন্য প্রতিটি নাগরিকের মৃত্যুসনদে প্রকৃত কারণ লিপিবদ্ধকরণ, উপজেলা বা জেলা পর্যায়ে প্রকাশিত সংবাদপত্র বা অন্যান্য গণমাধ্যমে প্রচারিত খবরের ভিত্তিতে তথ্য সংগ্রহের উপর জোর দেন। এছাড়া তিনি সড়ক দুর্ঘটনা নিরসনে মানসম্মত হেলমেটের সঠিক ব্যবহার ও সুনির্দিষ্ট গতিসীমা মেনে যানবাহন চলাচল নিশ্চিত করতে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কে পর্যাপ্ত সংখ্যক এআই ক্যামেরা স্থাপনের প্রতি গুরুত্বারোপ করেন। পাশাপাশি তিনি ডোপ টেস্টের মাধ্যমে চালকদের মাদক গ্রহণ পরীক্ষা চালানোর জন্য সহায়তা চান এবং চালকদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও ঢাকা মেট্র্রোপলিটান পুলিশ কর্মকর্তাদের ট্রাফিক আইন প্রয়োগের দক্ষতা বৃদ্ধিমূলক প্রশিক্ষণ প্রদানের জন্য অংশীজনদের সহযোগিতা প্রদানের আহ্বান জানান।
এই মতবিনিময় সভায় রোড সেফটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার জনাব কাজী বোরহান উদ্দিন সড়ক দুর্ঘটনা সংশ্লিষ্ট আচরণগত ঝুঁকিসমূহ এবং এগুলো থেকে উত্তরণের জন্য দেশের বিদ্যমান আইন এবং বিধিমালা বিষয়ক গবেষণার তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরেন। সিআইপিআরবি এর উপ-নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম মাহমুদ চৌধুরী সামগ্রিক রোড সেফটি বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।
সভায় অংশগ্রহণকারীগণ যানবাহনে সিটবেল্ট ও সুরক্ষিত শিশু আসন নিশ্চিত করা, চালকদের প্রতিবছর স্বাস্থ্য পরীক্ষা, শব্দ দূষণ কমানো এবং চালক ও পথচারীদের মধ্যে জনসচেতনতা বাড়াতে আরও সমন্বিত কার্যক্রম গ্রহণের বিষয়ে অভিমত ব্যক্ত করেন। অংশগ্রহণকারীগণের মধ্যে থেকে পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রতিনিধি বলেন, শব্দদুষণ নিয়ে তারা নিয়মিত কাজ করছেন এবং আইন প্রয়োগ করে পরিস্থিতি উত্তরণের চেষ্টা করছেন। অংশগ্রহণকারীদের একজন বলেন ঢাকাকে বসবাস উপযোগী করতে দুটো বিষয়ের (ফাইন) বাস্তবায়ন আবশ্যক। একটা হলো শহরকে সুন্দর করা, আর অন্যটি হলো শহর ধংসের জন্য যারা যেসব কাজ করছে সেসবের জন্য তাদের জরিমানা (ফাইন) করা। বিআইজিআরএস এর প্রতিনিধি জানান তারা সড়ক নিরাপত্তার উন্নয়নের ট্রাফিক আইনের প্রয়োগ বিষয়ে ৪০০ পুলিশ সদস্যের দক্ষতাবৃদ্ধিমূলক প্রশিক্ষণ প্রদান করেন।
সভাপতি তার বক্তব্যে সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে ডিএমপির চলমান কার্যক্রমগুলো তুলে ধরেন। তারমধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, পূর্বাচল ৩০০ ফিট রাস্তাসহ বিভিন্ন রাস্তায় স্পিড ক্যামেরা স্থাপন, মহাখালী সহ অন্যান্য বাসস্ট্যান্ড থেকে অপ্রয়োজনীয় বাসগুলো অন্যত্র স্থানান্তর, শব্দদুষণ নিয়ন্ত্রণের জন্য Noise Barrier মেশিন স্থাপন ইত্যাদি।
পরবর্তীতে তিনি কোন কোন প্রতিষ্ঠান সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কি কাজ করেন এবং সেসকল প্রতিষ্ঠান কিভাবে ডিএমপিকে সহায়তা করতে পারে সেগুলো সম্পর্কে জানতে চান। তিনি যে বিষয়গুলোর উপর গুরুত্ব দেন সেগুলো হলো; আইন প্রয়োগসহ অন্যান্য কাজে ডিএমপিতে কর্মরত পুলিশ সদস্যদের সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রশিক্ষণ, যানবাহনের গতি পরিমাপের জন্য পুলিশকে স্পিড রাডার ক্যামেরা সরবারাহ করা, সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য টিভিসি তৈরিতে ডিএমপিকে সহায়তা করা, মানসম্মত স্ট্যান্ডার্ড হেলমেট তৈরি করে আইন প্রয়োগে প্রশিক্ষণ ও উপকরণ দিয়ে ডিএমপিকে সহায়তা করা। এছাড়া তিনি সমন্বিত সড়ক নিরাপত্তা আইনের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে জানতে চান। পাশাপাশি সিআইপিআরবি প্রস্তাবিত সড়ক দুর্ঘটনার তথ্যের তারতম্য ও আন্ডার রিপোর্টিং কমাতে পুলিশের তথ্যের সাথে হাসপাতালের তথ্যের তুলনামূলক চিত্র অনুধাবন করার জন্য একটি গবেষণা পরিচালনা করার প্রতি সমর্থন দেন। এছাড়া উক্ত কাজে ঢাকার সকল হাসপাতালগুলোকে অন্তুর্ভূক্ত করারও পরামর্শ দেন।
সভাপতি দৃঢ়চিত্তে আশ্বাস প্রদান করেন সড়ক দুর্ঘটনা নিরসনে ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ সবর্দা প্রস্তুত এবং যে কোন প্রতিষ্ঠান তাদের কাছে কোন সহায়তা চাইলে ডিএমপি-এর পক্ষ থেকে সার্বাত্বক সহযোগিতা পাওয়া যাবে।