চড়াই পাখির-কড়চা: প্রতীক বনাম আক্ষরিকতা – মোহীত উল আলম

চড়াই পাখির-কড়চা: প্রতীক বনাম আক্ষরিকতা

মোহীত উল আলম

আমার এই ঈদের প্রাক্কালে একটা অভিজ্ঞতা হয়েছে, যেটির প্রেক্ষাপটে রজনীকান্ত সেনের বিখ্যাত কবিতা “বাবুই পাখিরে ডাকি বলিছে চড়াই”-টির একটি নতুন মূল্যায়ন করতে ইচ্ছে হচ্ছে। আগে কবিতাটি একবার দেখি:

বাবুই পাখিরে ডাকি, বলিছে চড়াই,
“কুঁড়ে ঘরে থেকে কর শিল্পের বড়াই,
আমি থাকি মহাসুখে অট্টালিকা পরে
তুমি কত কষ্ট পাও রোদ, বৃষ্টি, ঝড়ে।”

বাবুই হাসিয়া কহে, “সন্দেহ কি তাই?
কষ্ট পাই, তবু থাকি নিজের বাসায়।
পাকা হোক, তবু ভাই, পরের ও বাসা,
নিজ হাতে গড়া মোর কাঁচা ঘর, খাসা।”

__রজনীকান্ত সেন

অত্যন্ত দারুণ এই কবিতার মাধ্যমে কবি প্রতীকী অর্থে বাবুই পাখিকে স্বাবলম্বনহীন মানুষের স্বাবলম্বনতা ও পরিশ্রমের প্রতীক হিসেবে নিয়ে, চড়াই পাখিকে এর বিপরীতে, অর্থাৎ পরজীবী, পরনির্ভরশীল, অলস, পরশ্রীকাতর ও স্বার্থান্বেষী মানুষের প্রতীক হিসেবে নিয়েছেন। দ্বিতীয়ত, বাবুই পাখিকে ন্যায্য কারণে তিনি শিল্পী, বা কল্পনাধারী বা সৃজনশীল মানুষের প্রতীক হিসেবে নিয়ে চড়াইকে নিতান্ত কল্পনাবিহীন, অশিল্পীসুলভ চরিত্রের অধিকারী মানুষদের প্রতীক হিসেবে পরিগণিত করেছেন।

মানুষের এ দ্বিকৌণিক ও পরষ্পরবিরোধী সামাজিক অবস্থানকে কবি পাখি চিত্রকল্পের মাধ্যমে এত চিরকালীন প্রেক্ষাপটে উপস্থাপন করেছেন যে এইটি বাংলা লঘু কবিতার ক্ষেত্রে একটি স্থায়ী আসন গেড়ে বসেছে। আমার এই লেখায় এই মহৎ কবিতার স্থায়ী মর্যাদাকে আঘাত করার কোন অভিপ্রায় নেই, কিন্তু শুধু আমার সম্প্রতি একটি অভিজ্ঞতার আলোকে বলতে চাই যে কবিতাটিতে আরও নতুন ইঙ্গিত সংযোজন করা যেতে পারে। অর্থাৎ, আমি রজনীকান্ত সেনের এ বিখ্যাত কবিতাটি নতুন অর্থ নিয়ে পড়তে বাধ্য হলাম।

ঘটনাটা এরকম: কিছুদিন আগে আমি বেডরুমে একটি এসি লাগাই। কিন্তু এসি আমার তেমন সহ্য হয় না, খুকুরও না। ফলে এসিটি মাসের পর মাস বন্ধই থাকে। ইদানীং গরম খুব বেশি পড়াতে এসি দিতে গিয়ে দেখি এসি চলছে বটে, কিন্তু সাথে সাথে চড়ুই পাখির চিকির চিকির ডাক শোনা যাচ্ছে। কী ব্যাপার, এসির ভিতরে চড়ুই পাখি কীভাবে ঢুকলো! ভাবলাম, এসি চললে বোধহয় চড়ুইটা মারা যাবে, তাই সাথে সাথে বন্ধ করে দিলাম। তখন লক্ষ করলাম যে এসির বডির ভিতরে খড়ের আলামতও দেখা যাচ্ছে। ছাদে গিয়ে দেখলাম, এসি ফিটার এসি ফিট করেছিল ঠিকই কিন্তু সে দেয়ালে ক্যাবল ঢোকানোর জায়গাটা সিমেন্ট দিয়ে বন্ধ করে দেয়নি, ফলে ঐ ফোকর দিয়ে চড়ুই পাখিটা ঢুকে এসির ভিতর বাসা বেঁধে বসে আছে।

তো এসির ফিটারকে খবর দিলাম, বললাম যে চড়ুই পাখিটা মারা যেতে পারে এসি ছাড়লে, সে যেন এসে তাড়াতাড়ি সমস্যাটা সহজ করে দেয়। এসির মিস্ত্রী আসলো, সিমেন্ট, দড়া, আর টুকটাক জিনিষ নিয়ে। সে এসিটা নামিয়ে খুলে দেখে, চড়ুই পাখি শুধু বাসা বাঁধেনি, বিশাল খড়ের গাদা বানিয়ে রেখেছে, আর তার মধ্যে আবিস্কার হলো দুটো জ্যান্ত শাবক, এতটাই শিশু যে উড়তেই শেখেনি। মিস্ত্রী বাচ্চা দুটো আমার হাতে দিলে আমি হাতের ভিতরে ওদের কিলবিল করার স্পর্শে এক পরম মায়া অনুভব করলাম, আর তখনই আমার মনে হলো রজনীকান্তের বিখ্যাত কবিতাটির একটি কাউন্টার ডিসকোর্সও সাজানো যায়।
খুকুকে বললাম, বাচ্চা দুটো এতই বাচ্চা যে মায়ের সহযোগিতা না পেলে হয়তো বাঁচবে না। অভ্র আর ফামিও চিন্তায় পড়ে গেল। মা পাখির সঙ্গে শাবক পাখি দুটোর সংযোগ কীভাবে ঘটাই! খুকু বলল, ছাদের ওপর একটি ট্রেতে করে রেখে আসি, মা পাখি বাচ্চাগুলোর খোঁজে এদিকেইতো আসবে, তখন দেখতে পাবে।

ছাদে গিয়ে রাখলাম, কিন্তু আকাশে চোখ দিয়ে দেখলাম কাক উড়ছে। কাকের রাডারে এ লোভনীয় উপহার চোখে পড়বেই। তখন আবার নীচে নামিয়ে এনে আমার ব্যালকনিতে রাখলাম। অন্তত গ্রিল গলে কাক ঢোকার সাহস করবে না। আর একটি চামচে করে পানি খাওয়ানোর চেষ্টা করলাম, দেখি, মুখ খুলছে না। একটু খিচুড়ির দুএকটি দানা নিয়ে মুখের কাছে ধরলাম, হঠাৎ দেখি ওদের একজন আমার আঙ্গুলে ঠোঁট দিয়ে ঠোকা মারলো। আমি খুবই আনন্দ বোধ করলাম, কারণ ভিডিওতে দেখেছি, পাখির মা পাখির শাবকদের কীভাবে খাদ্য খাওয়ায়। এই শাবক দুটিও আমি আঙ্গুল কাছে নিয়ে গেলে ঠোঁট পুরো উঁচু হয়ে খুলে দিচ্ছে, ওদের হা করা ঠোঁটের কোমল লাল রংটা আমিদেখতে পাচ্ছি, আর এ খোলা মুখে দুটো দুটো ভাতের দানা ঢুকিয়ে দিলাম। কিন্তু এই প্রাথমিক সেবা পেয়ে খানিকটা তারা কি তৃপ্ত হলো কিনা বুঝতে পারলাম না, কারণ এরপর ঠোঁট আর খোলেই না। খুললনাতো খুললই না। খিচুড়ি পছন্দ হয় নি, নাকি পেট ভরে গেছে বুঝতে পারলাম না।

দুপুর হয়ে গেছিলো। তাই একটু বিশ্রাম নিতে গেলাম। উঠে ব্যালকনিতে শাবকগুলোকে দেখতে গিয়ে দেখি, ওমা এর মধ্যে ওদের মায়ের সঙ্গে সংযোগ হয়েছে, আর শুধু মা পাখিটি নয় চার পাঁচটি, অর্থাৎ শাবকগুলোর খালা-ফুফু এরাও একত্র হয়ে শলা-পরামর্শ করছে কীভাবে বাচ্চাগুলোকে উদ্ধার করা যায়। বিড়াল কুকুর যেমন তাদের শাবককে ঘাড় কামড়ে স্থানান্তর করতে পারে, পাখির জগতে ঐ পদ্ধতি চলে না মনে হয়। তখন ধারণা করলাম যে সম্ভবত এরকমই হবে যে যতদিন বাচ্চাগুলোর পাখা ওড়ার জন্য প্রস্তুত না হয়, ততদিন মা তাদেরকে এই ব্যালকনিতে রেখেই খাওয়াবে, তারপর একদিন ফুড়ুৎ করে উড়াল দেবে। আমাদের জন্য, হায়,হায়।

মা পাখিটা সারাক্ষণ গ্রিলে বসে ডেকেই যায়, কিন্তু একবারও দেখলাম না বাচ্চাদের কাছে এসে খাওয়াতে। বা হয়তো আমরা আড়ালে থাকলে খাওয়ায়। খুকু আর ফামি পানি আর চাউল দিয়ে রেখেছে দুটি পাত্রে, কিন্তু সেখানেও কোন তারতম্য দেখলাম না। কিন্তু বাচ্চা দুটো আজ চারদিন ধরে বেঁচে আছে, যদিও সামান্য দুর্বল হয়ে গেছে। একটু গুগল করে খোঁজ নিয়ে জানলাম, চড়াই পাখির শাবক উড়তে ১৫/১৬ দিন সময় নেয়। খুব আশা করছি, সৃষ্টিকর্তা নিশ্চয় ওদেরকে উড়াল দেবার ক্ষমতা অর্জন পর্যন্ত বাঁচিয়ে রাখবেন।

রজনীকান্ত সেনের কবিতাটি নিয়ে যেখানে বাধা পাচ্ছি, সেটি প্রতীকীকরণের প্রক্রিয়ায় নয়, অর্থাৎ বাবুইকে স্বাবলম্বী আর চড়াইকে পরাবলম্বী, বা বাবুইকে শিল্পী পাখি আর চড়াইকে ব্রাত্য ভাবার মধ্যে নয়, আমি বলছি আক্ষরিকভাবে নিলে যে অর্থটি দাঁড়ায় সেটি পশু সচেতনতার যুগে, যখন পশুকে (পশু বলতে পক্ষীকেও বোঝাচ্ছি) বাঁচাতে হবে এই সচেতনতার পক্ষে বিশ্বব্যাপী নানান পশুপ্রেমী সংগঠন আন্দোলন চালাচ্ছে, তখন এই কবিতাটার সারমর্ম নয়, কিন্তু বিষয়বস্তু চ্যালঞ্জের সম্মুখীন হবে। যেমন ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের একটা ভিডিওতে জানলাম, নেকড়ে বাঘকে আমরা কুটিল, হিংস্র, ঝগড়াটে মানুষের সঙ্গে প্রতীকী অর্থে তুলনা করি, কিন্তু আক্ষরিক অর্থে কুকুর জাতীয় প্রাণির মধ্যে নেকড়েই নাকি সবচেয়ে সর্বসংহা। নিজের শাবকেরা বড় না হওয়া পর্যন্ত তারা চৌকিদারীতে থাকে। যেমন সাপ বলতেই আমরা প্রতীকী অর্থে মীরজাফরকে বুঝি, অথচ আক্ষরিক অর্থে সাপের অবস্থান অন্যরকম। সে আক্রান্ত না হলে কখনও ছোবল তোলে না।

আর নেকড়ে, সাপ, কুকুরের তুলনায় চড়াই পাখি সবিশেষ নিরীহ, কত যে নিরীহ এবং অসহায় সেটি আমি ঐ শাবকগুলোর আমার হাতের ভিতরে তিড়বিড় না করা পর্যন্ত বুঝতে পারতাম না। কাজেই কবিতাটি যে অনিচ্ছাকৃতভাবে শিশু মনে চড়াই পাখি সম্পর্কে বিরূপ মনোভাব তৈরি করতে পারে, সে জায়গাটাতে আমি কবিতাটি পুরোপুরি আগের অর্থে ব্যবহার করতে বাধা পাচ্ছি। এটাও বলে রাখি, পাঠকের প্রতিক্রিয়ার যথার্থতার (রিডার্স রেসপন্স থিওরি) প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সাহিত্য তত্ত্বের যে নতুন শাখা বিস্তৃত হচ্ছে, তাতে লেখকের সৃষ্টির পর তাঁকে মৃত ধরে (রোল্যান্ড বার্থজ) পাঠকের সমালোচনার স্বাধীনতা অনেকাংশে স্বীকৃত হয়েছে। সে অর্থে, আমি যদি কবিতাটির প্রতীকী চারিত্রের বাইরে গিয়ে এটির আক্ষরিকতার পর্যায়ে সমস্যা দেখতে পাই, খুব বেশি আমাকে অভিয়ুক্ত করা যাবে না বোধহয়। কারণ শিশু প্রতীকটা দেখবে পরে, আগে দেখবে পাখিটাকে।

আরও দূরতর একটি সমস্যা এই কবিতাটির বা কবির অগোচরে রয়ে গেছে। সেটি হলো, খুব ভালো করে মানুষের সভ্যতাকে ডিকনস্ট্রাক্ট করলে দেখা যাবে মানব সমাজ বৃহত্তরভাবে পারষ্পরিক নির্ভরতার সমাজ। একজন আলেকজান্ডার বা একজন চেঙ্গিস খানকে খুবই স্বাবলম্বী মানুষের ভাবমূর্তি হিসেবে ধরলেও, এঁদেরকে প্রতি পদে সৃষ্টি করছে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র। অবশ্যই ব্যক্তিমানুষের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবোধ আছে এবং থাকবে, তাদের ব্যক্তিগত উদ্যম ও অভিযাত্রা সমাজকে এগিয়ে নিয়ে গেছে ঠিকই, কিন্তু সেগুলিকে দেখতে হবে হিমালয় পর্বত শ্রেণির গঠন অনুযায়ী। যেমন এভারেস্ট সর্বোচ্চ শৃঙ্গ হলেও এর কাছাকাছি উচ্চতার আরও ১৯টি শৃঙ্গ নাকি আছে, খোদ নেপালেই আছে গোটা কয়েক। এগুলি আশেপাশে থেকে কাঁধ না দিলে এভারেস্ট ঐরকম অভ্রলিংহ হতে পারতো না।

আবার যদি প্রেক্ষাপটের কথা ভাবি: চড়াই পাখির যেমন বাসা করতে দালান লাগে, বা আধুনিক অর্থে এসি লাগে, তেমনি বাবুই পাখির লাগে গাছ। মুক্তিযুদ্ধের সময় পালিয়ে নাজিরহাট পৌঁছালে ওখানে খালের পাড়ে খেজুর গাছ নাকি নারিকেল গাছে ঝুলন্ত বাবুইএর শত শত বাসা দেখে আমি অবাক হয়ে গেছিলাম। কাজেই ডিপেন্ডেনসি কালচার বা নির্ভরশীলতার সংস্কৃতির ঐতিহাসিক আঙ্গিক স্বীকার না করলে, বা এটাকে অস্বীকার করে একটা বক্তব্য দাঁড় করালে সেটি কালের কষ্টিপাথরে প্রশ্নের সম্মুখীন হতে পারে।

একজন মানব শিশুর মধ্যে চড়াই পাখি যে অন্য যে কোন পাখির মতো নির্দোষ ও অসহায় সে আক্ষরিক পর্যায়ের অনুভূতির বিকাশে তাকে বাধা দেওয়া যাবে না।

তবে, বলদ, গাধা, শুয়োর, কুকুর আমরা বলেই থাকি নিম্নতর মানুষকে পরিচয় করানোর জন্য, আর উচ্চতর মানুষকে পরিচয় করাতে ব্যবহার করি সিংহ, বাঘ ইত্যাদি। আর কোমল ও সাদা মনের মানুষকে পরিচয় করাই ভেড়া, পায়রা ইত্যাদি দিয়ে। এই তুলনানির্ভর বাচিকতা ছাড়া মানুষের সংস্কৃতি তৈরিও হবে না।

কিন্তু তারপরও চড়াই পাখির প্রতি আমার যে দরদ উথলে উঠল সেটাও একটি প্রতিনিধিত্বকারী অনুভূতি হিসেবে এই কথাগুলি বললাম। রজনীকান্ত সেনের প্রতি আবার অগাধ শ্রদ্ধা প্রকাশ করে লেখাটি শেষ করছি।

সবাইকে ঈদের শুভেচ্ছা।

=শেষ=

১০/৪/২৪

তোমার অনলাইনের জন্য পাঠালাম।

মোহীত উল আলম
Comments (0)
Add Comment