টিএফজিবিভি প্রতিরোধে নাগরিক সমাজ জোরালো ভূমিকা নিতে পারে – হীরেন পণ্ডিত
বাংলাদেশ ডিজিটাল রূপান্তরের যাত্রায় এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে অবস্থান করছে এর সাথে সাথে বাড়ছে প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা (টিএফজিবিভি)। বৈশ্বিক তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির (আইসিটি) দ্রুত অগ্রগতি এবং ডিজিটাল জনসেবার ক্রমবর্ধমান চাহিদা এ প্রক্রিয়াকে আরও জরুরি ও প্রাসঙ্গিক করে তুলেছে।
বাংলাদেশের উন্নয়ন অভিযাত্রায় ডিজিটাল রূপান্তর এখন আর একটি বিকল্প নয়, বরং টেকসই অগ্রগতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। এই উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে শাসন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা, সেবাপ্রদানকে আরও দক্ষ ও স্বচ্ছ করা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করা সম্ভব হচ্ছে। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই বিভিন্ন ডিজিটাল উদ্যোগ হাতে নিয়েছে, যা জনসেবা সহজীকরণ থেকে শুরু করে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতিশীলতায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।
শাসনব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে আইসিটি একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। ই-গভর্নেন্স কার্যক্রম চালু হওয়ার ফলে সরকারি সেবায় জবাবদিহিতা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং নাগরিকরা দ্রুত ও স্বচ্ছ সেবা পাচ্ছেন। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে নীতি প্রণয়ন, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সেবা প্রদান প্রক্রিয়ায় নাগরিকদের সম্পৃক্ততা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সেবাপ্রদান উন্নয়নের ক্ষেত্রে প্রযুক্তি নির্ভর সমাধান একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। অনলাইন সেবা, মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন ও ডিজিটাল হেল্পডেস্কের মাধ্যমে নাগরিকরা ঘরে বসেই প্রয়োজনীয় সরকারি ও বেসরকারি সেবা পাচ্ছেন। এর ফলে সময় ও খরচ কমছে এবং মানুষের জীবনমান উন্নত হচ্ছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ব্যক্তি ও থানা পর্যায়ে জেলা ভিত্তিক তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ ও প্রয়োগ পরিমাপ বিষয়ক সর্বশেষ পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়- দেশে বর্তমানে কম্পিউটার ব্যবহারকারী ৯.১%, ইন্টারনেট ব্যবহার করছেন ৫৬.২%, মোবাইল ফোন ব্যবহারকারী ৯৮.৯%, স্মার্ট ফোন ব্যবহারকারী ৭২.৪%, ফিক্সড ফোন ব্যবহারকারী ০.৮%, রেডিও ব্যবহার করেন ১৫.১%, টেলিভিশন ৫৮.৯%, এবং বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী ৯৮.৯%। এই তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়েছে পরিসংখ্যানের জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০২৫ প্রতিবেদন হতে। তথ্য প্রযুক্তির বিকাশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এর অপব্যবহারও বেড়ে চলেছে, বেড়েছে প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডার ভিত্তিক সহিংসতাও। সমাজের নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ প্রতিনিয়ত অনলাইনে সহিংসতার শিকার হচ্ছেন, যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যকই নারী।
ডিসেম্বর, ২০২৪ এ ইউএনএফপিএ প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী বিশ্বে প্রতি ৩ জনের মধ্যে ২ জন নারী জীবনে অন্তত একবার অনলাইন সহিংসতার শিকার। বাংলাদেশে প্রায় ৮৯% নারী ও কন্যা শিশু এই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন। ৯-১৪ বছর বয়স থেকেই টিএফজিবিভির ঝুঁকিতে থাকার প্রবণতা শুরু হয় এবং ১৮-৩০ বছরের তরুণীরা সবচেয়ে বেশি টিএফজিবিভির শিকার হন। ৭৫% ভুক্তভোগীই তাদের পরিবারকে এ বিষয়ে জানান না এবং কোন ধরণের আইনি ব্যবস্থাও নেন না। টিএফজিবিভি প্রতিকারে বাংলাদেশ সরকারের সবচাইতে কার্যকরী উদ্যোগ পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন (পিসিএসডিব্লিউ)-এর রিপোর্ট (২০২৪) অনুযায়ী, তাদের কাছে এ পর্যন্ত ৬০ হাজারের বেশি অভিযোগ দায়ের হয়েছে, যার- ৪১% ডক্সিংয়ের শিকার, ১৮% ফেসবুক আইডি হ্যাক, ১৭% ব্ল্যাকমেইল, ৯% ইমপার্সোনেশন, ৮% সাইবার বুলিংজনিত সমস্যা নিয়ে অভিযোগ করেছেন।
জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ) ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত ‘ভায়োলেন্স অ্যাগেইনস্ট উইমেন সার্ভে ২০২৪’ বাংলাদেশের নারীদের ডিজিটাল নিরাপত্তা নিয়ে এক গভীর উদ্বেগের ছবি তুলে ধরেছে। এই জরিপে দেখা গেছে, টিএফজিবিভির সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছেন তরুণীরা। ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে এই হার সর্বোচ্চ ১৬ শতাংশ; ২৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে ১৩.৩ শতাংশ; আর ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী কিশোরীদের মধ্যে ১১.৯ শতাংশ। অর্থাৎ বয়স যত কম, অনলাইনে ঝুঁকিও তত বেশি। তবে এ সহিংসতা শুধু তরুণীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; জরিপে দেখা গেছে, ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী নারীদের মধ্যেও ১.৪ শতাংশ এ ধরনের সহিংসতার শিকার হয়েছেন।
শিক্ষা ও প্রযুক্তি ব্যবহারের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে সহিংসতার চরিত্রও বদলেছে। জরিপে দেখা যায়, উচ্চশিক্ষিত নারীরাই তুলনামূলক বেশি টিএফজিবিভির লক্ষ্যবস্তু হচ্ছেন। স্নাতক বা তদূর্ধ্ব ডিগ্রিধারী নারীদের মধ্যে এর হার ১৮.৮ শতাংশ, এইচএসসি পাস নারীদের মধ্যে ১৬.৭ শতাংশ, আর এসএসসি পাস কিশোরীদের মধ্যে ১২.৮ শতাংশ। বিপরীতে, কমশিক্ষিত বা শিক্ষা থেকে বঞ্চিত নারীদের মধ্যে এ হার তুলনামূলক কম। বৈবাহিক অবস্থার বিচারে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছেন বিবাহিত হলেও স্বামীর থেকে আলাদা বা দূরে বসবাসরত নারীরা; তাঁদের মধ্যে এই সহিংসতার হার ১৯.৮ শতাংশ।
এই জরিপের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো, প্রযুক্তিনির্ভর সহিংসতা শুধু ডিভাইস-ব্যবহারকারীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।
প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার করেন না, এমন নারীদের মধ্যেও ৩.৪ শতাংশ কোনো না কোনোভাবে টিএফজিবিভির শিকার হয়েছেন। এই তথ্য স্পষ্ট করে যে, প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত সহিংসতা কেবল অনলাইন পরিসরের সমস্যা নয়; এটি অফলাইনে থাকা নারীদের গোপনীয়তা, মর্যাদা ও নিরাপত্তাকেও সমানভাবে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।এভাবে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে নারীর অংশগ্রহণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে অর্থনীতিসহ দেশের উন্নয়নের সব ক্ষেত্রে। কেননা দেশের অর্ধেক জনসংখ্যাকে অনলাইনে অনিরাপদ রেখে অগ্রগতির কোনো লক্ষ্য পূরণ করাই সম্ভব নয়। তাই প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডার-ভিত্তিক সহিংসতা সম্পর্কে ব্যাপক সচেতনতা বাড়ানো এবং সশ্লিষ্ট অংশীজন তথা সরকারি-বেসরকারী প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, নাগরিক সমাজ সংগঠন, আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, জনপ্রতিনিধি, নীতি-নির্ধারক এবং গণমাধ্যমের ভূমিকা জোরালো করার মাধ্যমে আমাদের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোতে সকলের বিশেষ গ্রামীণ নারীর জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা ভীষণভাবে জরুরি। আর তাই প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডার ভিত্তিক সহিংসতা এবং এটি প্রতিরোধ ও প্রশমনে আমাদের করণীয় সম্পর্কে জানা বোঝা একান্তভাবে জরুরি। জনসেবার ডিজিটালায়ন, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তির বিস্তার এবং উদ্ভাবননির্ভর অর্থনৈতিক পরিবর্তনের ফলে প্রযুক্তি আজ উন্নয়ন প্রক্রিয়ার একটি অপরিহার্য উপাদানে পরিণত হয়েছে। ই-গভর্ন্যান্স, অনলাইন সেবা, মোবাইল অ্যাপ ও বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম নাগরিকসেবা সহজতর করেছে, সময় ও ব্যয় কমিয়েছে এবং অংশগ্রহণের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে।
তবে এই অগ্রগতির পাশাপাশি প্রযুক্তির অপব্যবহারও ক্রমেই বাড়ছে। ডিজিটাল পরিসর এখন শুধু যোগাযোগ, শিক্ষা, তথ্যপ্রাপ্তি বা ব্যবসার ক্ষেত্র নয়; এটি হয়রানি, ব্ল্যাকমেইল, পরিচয় জালিয়াতি, ছবি বিকৃতি, ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস এবং নানামুখী সহিংসতারও ক্ষেত্র হয়ে উঠছে। এসব সহিংসতার শিকার হচ্ছেন অনেকেই, তবে নারী ও মেয়েরা তুলনামূলকভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
এর প্রভাব পড়ছে তাঁদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, অনলাইন অংশগ্রহণ, মানসিক সুস্থতা, শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং নেতৃত্ব বিকাশের ওপর। ফলে একটি নিরাপদ, ন্যায়ভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ডিজিটাল সমাজ গড়ে তুলতে প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধ এখন জরুরি নীতিগত ও সামাজিক অগ্রাধিকার।
প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা, সংক্ষেপে টিএফজিবিভি, বলতে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বা অন্যান্য প্রযুক্তিগত মাধ্যম ব্যবহার করে জেন্ডারের ভিত্তিতে কোনো ব্যক্তি, বিশেষ করে নারী ও মেয়েদের বিরুদ্ধে সংঘটিত সহিংসতা, হয়রানি, হুমকি, নজরদারি, অপমান, শোষণ বা ক্ষতিকর আচরণকে বোঝায়। এ ধরনের সহিংসতা আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে প্রযুক্তিনির্ভর হতে পারে এবং তা এক বা একাধিক ব্যক্তি দ্বারা সংঘটিত হতে পারে।
টিএফজিবিভির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, এটি কেবল অনলাইন পরিসরে সীমাবদ্ধ নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মেসেজিং অ্যাপ, মোবাইল ফোন, জিপিএস ট্র্যাকিং ডিভাইস, রেকর্ডিং যন্ত্র এবং অন্যান্য প্রযুক্তিগত মাধ্যম ব্যবহার করেও এ ধরনের সহিংসতা সংঘটিত হতে পারে। সে কারণে এটি শুধু প্রযুক্তিগত ঝুঁকির বিষয় নয়; বরং জেন্ডার বৈষম্য, ক্ষমতার অসমতা এবং ডিজিটাল নিরাপত্তাহীনতার একটি বহুমাত্রিক প্রকাশ।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ এনজিওস নেটওয়ার্ক ফর রেডিও এন্ড কমিউনিকেশন (বিএনএনআরসি) বাস্তবায়ন করছে ‘স্ট্রেনদেনিং রেজিলিয়েন্স এগেইনস্ট টেকনোলজি ফ্যাসিলিটেটেড জেন্ডার বেইসড ভায়োলেন্স (টিএফজিবিভি) অ্যান্ড প্রমোটিং ডিজিটাল ডেভেলপমেন্ট’ প্রকল্পটি। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে নাগরিকতা: সিভিক এনগেজমেন্ট ফান্ড (সিইএফ) কর্মসূচির অধীনে এতে অর্থায়ন করেছে সুইজারল্যান্ড দূতাবাস, গ্লোবাল এ্যাফেয়ার্স কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। কারিগরি সহায়তা দিয়েছে জিএফএ কনসালটিং গ্রুপ।
এর মাধ্যমে দেশের জেলা পর্যায়ে এবং তৃণমূলে কমিউনিটি রেডিওকে সম্পৃক্ত করে সচেতনতা বৃদ্ধি, সক্ষমতা উন্নয়ন, ভুক্তভোগীদের সহায়তা এবং বহুপক্ষীয় অংশীদারত্ব জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই উদ্যোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, স্থানীয় পর্যায়ে সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা জোরদার করা এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তোলা। স্থানীয় পর্যায়ে নাগরিক সমাজ সংগঠনগুলো সচেতনতা সৃষ্টি, ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে চিহ্নিত করা, প্রাথমিক সহায়তা ও রেফারেল প্রদান, সামাজিক সংলাপ সৃষ্টি এবং নীতিপর্যায়ে স্থানীয় বাস্তবতা তুলে ধরার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু প্রযুক্তিনির্ভর জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার ধরন, প্রভাব, প্রতিরোধ কৌশল, আইনি প্রতিকার, ডিজিটাল প্রমাণ সংরক্ষণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সেবার সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের বিষয়ে এ সংগঠনগুলোর সক্ষমতা আরও জোরদার করা প্রয়োজন। জেলাভিত্তিক এই কর্মশালার লক্ষ্য হলো নাগরিক সমাজ সংগঠনগুলোকে প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা (টিএফজিবিভি) বিষয়ে ধারণাগত স্পষ্টতা, প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি এবং মাঠপর্যায়ের কার্যকর সম্পৃক্ততার সক্ষমতা বৃদ্ধি করা। একই সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, জনপ্রতিনিধি, গণমাধ্যম, প্রযুক্তি-সংশ্লিষ্ট অংশীজন এবং নাগরিক সমাজের মধ্যে সমন্বিত বোঝাপড়া ও সহযোগিতার ভিত্তি জোরদার করা। এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নাগরিক সমাজ সংগঠনগুলো প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও কারিগরি দক্ষতা অর্জন করবে, যাতে তারা টিএফজিবিভি মোকাবিলায় স্থানীয় পর্যায়ে আরও সক্রিয় ও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
নাগরিক সমাজ সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিদের প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা (টিএফজিবিভি) বিষয়ে জ্ঞান, দক্ষতা ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি জোরদার করে স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে ভুক্তভোগীদের দ্রুত আইনি, সামাজিক ও মনোসামাজিক সহায়তা নিশ্চিত করার পথ সুদৃঢ় করতে পারে। ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার, টু-ফ্যাক্টর ভেরিফিকেশন এবং ভুলতথ্য ও অপতথ্য যাচাইয়ের কৌশল বিষয়ে ব্যবহারিক জ্ঞান লাভ করে এ বিষয়ে কাজ করতে পারে।
জেলা পর্যায়ে টিএফজিবিভি মোকাবিলায় প্রধান চ্যালেঞ্জ প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা কী, এর ধরন কী এবং কোথায় বা কীভাবে অভিযোগ করতে হয়, সে বিষয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে স্পষ্ট ধারণার অভাব রয়েছে। অনেক ভুক্তভোগী আনুষ্ঠানিক প্রতিকার ব্যবস্থার বাইরে থেকে যান, নীরবতা বৃদ্ধি পায় এবং সহিংসতার প্রকৃত মাত্রা আড়ালে থেকে যায়। সুনির্দিষ্ট আইন, নীতিমালা ও নির্দেশনার ঘাটতি টিএফজিবিভি মোকাবিলায় পৃথক ও সুস্পষ্ট আইনগত সংজ্ঞা, নীতিগত দিকনির্দেশনা এবং বাস্তবায়নযোগ্য প্রোটোকলের অভাব লক্ষ্য করা গেছে।
বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি আইন রয়েছে যা টিএফজিবিভি-এর ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যেতে পারে, যার মধ্যে রয়েছে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন (২০০০), পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন (২০১২) এবং সম্প্রতি প্রণীত সাইবার নিরাপত্তা আইন (২০২৬)। এই আইনগুলো একটি ভিত্তি প্রদান করলেও বড় ধরনের ফাঁকফোকর রয়ে গেছে। আইন প্রয়োগ প্রায়শই অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, আইনি প্রক্রিয়া দীর্ঘ ও জটিল হতে পারে এবং অনেক ভুক্তভোগী তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন নন।
তবে রাজনৈতিক স্তরে কিছু ইতিবাচক লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। ২০২৬ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) অনলাইন লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আইনি সুরক্ষা জোরদার করার অঙ্গীকার করেছে। এই ইশতেহারে আইসিটি খাতের সম্প্রসারণ, উদীয়মান প্রযুক্তিতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের জন্য জনবল প্রস্তুত করার ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে। তবে এই প্রতিশ্রুতিগুলোকে অবশ্যই কার্যকর পদক্ষেপে রূপান্তরিত করতে হবে। টিএফজিবিভি মোকাবিলায় কেবল নীতিগত বিবৃতি নয়, বরং টেকসই বিনিয়োগ, সমন্বয় এবং জবাবদিহিতা প্রয়োজন।
টিএফজিবিভি মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব, ভূমিকা ও জবাবদিহির ক্ষেত্র অস্পষ্ট থাকে, ফলে প্রতিকার প্রক্রিয়া দুর্বল বা বিলম্বিত হয়। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা জেলা পর্যায়ের সাইবার অপরাধ তদন্ত কাঠামো হারানো মোবাইল ফোন, অ্যাকাউন্ট হ্যাকিং বা আর্থিক প্রতারণার ঘটনায় তুলনামূলক বেশি সক্রিয় হলেও, জেন্ডার-সংবেদনশীল ডিজিটাল সহিংসতা মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় বিশেষায়িত দক্ষতা, প্রশিক্ষিত জনবল ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ঘাটতি আছে। ভুক্তভোগীরা সময়মতো সুরক্ষা বা সহায়তা পান না, তদন্ত দুর্বল হয় এবং অপরাধীরা দায়মুক্তির সুযোগ পায়।
আইনি জটিলতা ও মামলা গ্রহণে অনীহা টিএফজিবিভি-সংক্রান্ত ঘটনায় মামলা গ্রহণে বিলম্ব, গড়িমসি বা নিরুৎসাহিত করার প্রবণতার কথা উঠে এসেছে। দীর্ঘসূত্রতাপূর্ণ বিচারপ্রক্রিয়া এবং এ-সংক্রান্ত বিশেষায়িত আইন বিষয়ে সীমিত দক্ষতাও চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ভুক্তভোগীরা অভিযোগ জানাতে নিরুৎসাহিত হন, বিচারপ্রাপ্তির প্রতি আস্থা কমে যায় এবং ন্যায়বিচার বিলম্বিত হয়। সামাজিক কলঙ্ক, কুসংস্কার ও পারিবারিক অসহযোগিতা, সামাজিক লোকলজ্জা, মানহানির আশঙ্কা এবং ভুক্তভোগীকেই দায়ী করার প্রবণতা অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীকে নীরব থাকতে বাধ্য করে। পরিবার থেকেও সহায়তার বদলে প্রযুক্তি ব্যবহারে বিধিনিষেধ বা গোপন রাখার চাপ আসে। ভুক্তভোগীর মানসিক চাপ বাড়ে, সহায়তা চাওয়ার সুযোগ সংকুচিত হয় এবং নির্যাতনের চক্র দীর্ঘায়িত হতে পারে। ডিজিটাল প্রমাণ সংরক্ষণে দুর্বলতা আতঙ্ক, সামাজিক চাপ বা গোপনীয়তা ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কায় ভুক্তভোগীরা অনেক সময় চ্যাট হিস্ট্রি, ছবি, ভিডিও, ভয়েস রেকর্ড বা অন্যান্য ডিজিটাল আলামত মুছে ফেলেন। তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় গ্রহণযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন কঠিন হয়ে পড়ে, ফলে আইনি প্রতিকার দুর্বল হয়।
স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদ্রাসার শিক্ষক ও কর্মচারীবৃন্দ শিশু ও কিশোর-কিশোরীরা অনলাইন ঝুঁকিতে থাকলেও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল নিরাপত্তা, অনলাইন আচরণ, সাইবার ঝুঁকি এবং প্রযুক্তিনির্ভর সহিংসতা বিষয়ে নিয়মিত ও কাঠামোবদ্ধ সচেতনতামূলক কার্যক্রমের অভাব রয়েছে। শিক্ষক কর্মচারীবৃন্দ, শিক্ষার্থীরা ঝুঁকি চিহ্নিত করতে ব্যর্থ হয়, অনলাইন সহিংসতার প্রতি বেশি সংবেদনশীল হয়ে পড়ে এবং প্রতিরোধমূলক প্রস্তুতি দুর্বল থাকে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে টিএফজিবিভির শিকার ব্যক্তিদের জন্য পেশাদার মানসিক সহায়তা, কাউন্সেলিং এবং ট্রমা-সাপোর্ট সেবার ঘাটতি রয়েছে। ভুক্তভোগীরা দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপ, উদ্বেগ, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও আত্মবিশ্বাসহীনতায় ভুগতে পারেন, যা পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে।
প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সেবা-প্রবেশে অতিরিক্ত প্রতিবন্ধকতা, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, জাতিগত সংখ্যালঘু, দলিত সম্প্রদায় এবং অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে ভাষা, সামাজিক অবস্থান, আর্থিক সীমাবদ্ধতা, চলাচলজনিত প্রতিবন্ধকতা এবং তথ্যপ্রাপ্তির ঘাটতি সেবা-প্রাপ্তিকে আরও জটিল করে তোলে। ডিজিটাল বৈষম্য আরও গভীর হয়, সহিংসতার প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠী আরও বেশি অনিরাপদ অবস্থানে পড়ে। নাগরিক সমাজ সংগঠন, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ভিত্তিক প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার ঘাটতি নাগরিক সমাজ সংগঠন ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর কর্মীবৃন্দ অনলাইন ঝুঁকিতে থাকলেও ডিজিটাল নিরাপত্তা, অনলাইন আচরণ, সাইবার ঝুঁকি এবং প্রযুক্তিনির্ভর সহিংসতা বিষয়ে নিয়মিত ও কাঠামোবদ্ধ সচেতনতামূলক কার্যক্রমের অভাব রয়েছে।
নাগরিক সমাজ সংগঠন ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার কর্তৃপক্ষ ঝুঁকি চিহ্নিত করতে ব্যর্থ হয়, অনলাইন সহিংসতার প্রতি বেশি সংবেদনশীল হয়ে পড়ে এবং প্রতিরোধমূলক প্রস্তুতি দুর্বল থাকে।
পর্যবেক্ষণ এবং অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা (টিএফজিবিভি) প্রতিরোধ, প্রতিকার এবং ন্যায়বিচারপ্রাপ্তি জোরদারে প্রতিটি জেলায় বিদ্যমান নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটি, সাইবার অপরাধ দমন কমিটি এবং আইসিটি-বিষয়ক কমিটির কার্যক্রম আরও কার্যকর করতে নাগরিক সমাজ সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে সক্রিয় অ্যাডভোকেসি প্রয়োজন। একই সঙ্গে এসব কমিটির কার্যপরিধিতে টিএফজিবিভি বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করে এ বিষয়ে নিয়মিত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করা দরকার। জেলা প্রশাসক ও ইউএনও কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত গণশুনানিতে টিএফজিবিভিকে একটি সুনির্দিষ্ট সেবা-ইস্যু হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য নাগরিক সমাজ সংগঠনগুলোকে উদ্যোগী হতে হবে। পাশাপাশি ভুক্তভোগীদের গণশুনানির মাধ্যমে সহায়তা পাওয়ার বিষয়ে উৎসাহিত ও সহযোগিতা করা প্রয়োজন। ইউনিয়ন পরিষদসহ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে টিএফজিবিভি প্রতিরোধ ও প্রতিকারবিষয়ক বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করতে নাগরিক সমাজের সক্রিয় ভূমিকা জরুরি।
নাগরিক সমাজ সংগঠনগুলোর চলমান ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনায় টিএফজিবিভি বিষয়টি আরও সুস্পষ্টভাবে যুক্ত করা প্রয়োজন। নিয়মিত স্টাফ মিটিং, সুবিধাভোগীদের সঙ্গে বৈঠক, সচেতনতামূলক কার্যক্রম এবং নতুন কর্মসূচি পরিকল্পনায় এ বিষয়টি অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা, বিশেষ করে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্তদের জন্য টিএফজিবিভি বিষয়ে নিবিড় ও কাঠামোবদ্ধ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। বিভাগীয় সাইবার ট্রাইব্যুনালের ভৌগোলিক দূরত্ব বিবেচনায় নিয়ে জেলা পর্যায়ে ভার্চুয়াল শুনানির সুযোগ চালু করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে ভুক্তভোগীদের জন্য একটি বিশেষায়িত সহায়তা ডেস্ক স্থাপন করা যেতে পারে। সুনির্দিষ্ট আইন, নীতিমালা ও বাস্তবায়নযোগ্য নির্দেশনার অভাব থাকায় এ বিষয়ে পৃথক ও কার্যকর আইনগত ও নীতিগত কাঠামো প্রণয়ন এখন জরুরি। সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৫ এবং ডিজিটাল আলামত ব্যবস্থাপনা বিষয়ে প্যানেল আইনজীবীদের বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার জন্য নাগরিক সমাজ সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে অ্যাডভোকেসি জোরদার করা প্রয়োজন। নাগরিক সমাজ সংগঠন ও লিগ্যাল এইড অফিসের মধ্যে একটি দ্রুত রেফারেল ব্যবস্থা তৈরি করা জরুরি, যাতে তৃণমূলের ভুক্তভোগীরা দীর্ঘসূত্রতা বা আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ছাড়াই দ্রুত আইনি সহায়তা পেতে পারেন। স্কুল-কলেজে নিয়মিত ডিজিটাল সেফটি সেশন আয়োজন এবং টিএফজিবিভি-সংক্রান্ত অভিযোগ গ্রহণ ও পরামর্শ প্রদানের জন্য সহায়ক ডেস্ক চালুর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
গ্রামীণ নারী, জনপ্রতিনিধি ও অভিভাবকদের সচেতন করতে উঠান বৈঠক আয়োজন এবং অভিভাবকদের ডিজিটাল সাক্ষরতা বাড়াতে পজিটিভ প্যারেন্টিংভিত্তিক প্রচারাভিযান পরিচালনা করা প্রয়োজন। স্থানীয় বা আঞ্চলিক ভাষায় ডিজিটাল নিরাপত্তাবিষয়ক সহজবোধ্য কনটেন্ট, যেমন লিফলেট, স্বল্পদৈর্ঘ্য ভিডিও বা পথনাটক তৈরি করলে তা প্রান্তিক ও স্বল্পশিক্ষিত মানুষের কাছে সহজে পৌঁছাবে। নাগরিক সমাজ সংগঠনগুলোর উদ্যোগে প্রতি জেলায় বছরে অন্তত একটি টিএফজিবিভি বিষয়ক বার্ষিক সম্মেলন আয়োজন করা যেতে পারে, যেখানে বিগত বছরের কার্যক্রম পর্যালোচনা এবং পরবর্তী বছরের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হবে। জেলা পর্যায়ে টিএফজিবিভির পরিস্থিতি, গৃহীত পদক্ষেপ, চ্যালেঞ্জ ও অগ্রগতি তুলে ধরে নাগরিক সমাজ সংগঠনগুলোর উদ্যোগে প্রতি বছর একটি বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করা প্রয়োজন।
নাগরিক সমাজ সংগঠনগুলোর বর্তমান ও ভবিষ্যৎ কার্যক্রমে টিএফজিবিভি বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র তুলে ধরতে নিয়মিত ছোট পরিসরে জরিপ পরিচালনা করা প্রয়োজন। স্থানীয় সিএসও প্রতিনিধি এবং জেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে একটি মনিটরিং ও মূল্যায়ন কাঠামো তৈরি করা দরকার, যাতে গৃহীত পদক্ষেপগুলোর কার্যকারিতা নিয়মিত পর্যালোচনা করা যায়। স্থানীয় আইএসপি, ক্যাবল অপারেটর এবং মোবাইল ব্যাংকিং সেবা দাতাদের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে অপরাধ সংশ্লিষ্ট লেনদেন শনাক্ত করা এবং ক্ষতিকর কনটেন্ট প্রতিরোধে একটি কার্যকর প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
জেলা বা বিভাগীয় পর্যায়ে নাগরিক সমাজ সংগঠনগুলোর সমন্বয়ে একটি ডিজিটাল অধিকার ও নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা যেতে পারে, যার মাধ্যমে অভিজ্ঞতা, তথ্য, কেস স্টাডি ও প্রয়োজনীয় সম্পদ দ্রুত বিনিময় করা সম্ভব হবে। পরিবারে এমন একটি উন্মুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে সন্তান বা পরিবারের কোনো সদস্য অনলাইনে হয়রানি, উত্যক্ত বা ব্ল্যাকমেইলের শিকার হলে ভীতি বা লোকলজ্জা ছাড়াই পরিবারের কাছে সহায়তা চাইতে পারে। পরিবারে মোবাইল ফোন, ফেসবুক ও অন্যান্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের নিরাপদ ব্যবহার নিয়ে আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। শিশু-কিশোরদের প্রযুক্তি ব্যবহারের নিয়ম, ঝুঁকি ও সতর্কতা সম্পর্কে ধারণা দেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে প্রযুক্তিপণ্য বিক্রেতাদেরও বিক্রয়ের সময় নিরাপদ ব্যবহারের বিষয়ে মৌখিকভাবে পরামর্শ দেওয়া উচিত। তথ্য চুরি, উত্যক্ত বা ব্ল্যাকমেইলের শিকার হলে ভয়ে নীরব না থেকে ‘পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন’ (পিসিএসডব্লিউ) বা স্থানীয় বিদ্যমান সহায়তা সেবার সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ করতে হবে। অনলাইনে ব্যক্তিগত তথ্য, ছবি বা অবস্থান শেয়ার করার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। একই সঙ্গে পাবলিক ওয়াই-ফাই বা উন্মুক্ত চার্জিং পয়েন্ট ব্যবহারে সচেতন থাকতে হবে।
সবশেষে বলা যায়, নিরাপদ ডিজিটাল উন্নয়ন কেবল প্রযুক্তিগত সমাধানের বিষয় নয়; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও নীতিগত প্রক্রিয়া। কর্মশালায় আলোচিত দোষারোপমুক্ত সামাজিক পরিবেশ এবং সমন্বিত প্রতিক্রিয়া কাঠামো তৃণমূল পর্যায়ে কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধ, প্রতিকার ও ভুক্তভোগী-সহায়তা ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন সম্ভব হবে।
লেখক : হীরেন পণ্ডিত
কলামিস্ট ও গবেষক