সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন কার্যকর ও সমন্বিত সড়ক নিরাপত্তা আইন

মতামত

0

মো: বজলুর রহমান, সফরা জাহান: বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা এখন আর কেবল পরিবহন খাতের একটি সমস্যা নয়। এটি জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি, সামাজিক নিরাপত্তা এবং মানুষের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি জাতীয় সংকটে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষ নিহত ও আহত হচ্ছেন। কেউ হারাচ্ছেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে, কেউ আবার দুর্ঘটনার পর স্থায়ী প্রতিবন্ধিতার শিকার হয়ে স্বাভাবিক জীবন ও কর্মক্ষমতা হারাচ্ছেন। ফলে একটি দুর্ঘটনার ক্ষতি কেবল দুর্ঘটনাস্থলেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে পরিবার, সমাজ ও জাতীয় অর্থনীতির ওপর।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতিবছর আনুমানিক ১১ লাখ ৬০ হাজার মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান এবং আরও ২ থেকে ৫ কোটি মানুষ অপ্রাণঘাতী আঘাতের শিকার হন। তাদের অনেকেই স্থায়ীভাবে প্রতিবন্ধী হয়ে পড়েন। ৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী শিশু ও তরুণদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ সড়ক দুর্ঘটনা। একই সঙ্গে বিশ্বব্যাপী সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতদের বড় একটি অংশ পথচারী, সাইকেল আরোহী ও মোটরসাইকেল আরোহীর মতো ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক ব্যবহারকারী।
বাংলাদেশের বাস্তবতাও অত্যন্ত উদ্বেগজনক। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই বছর দেশে ৭ হাজার ৫৮৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ হাজার ৩৫৯ জন নিহত এবং ১৬ হাজার ৪৭৬ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ৯৬২ জন নারী এবং ১ হাজার ৮ জন শিশু।
এই পরিসংখ্যানের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকগুলোর একটি হলো মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা। ২০২৫ সালে ৩ হাজার ২৯টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৬৭১ জন নিহত হয়েছেন। একই বছরে ১ হাজার ৫৬৪ জন পথচারীর মৃত্যু হয়েছে। এই বাস্তবতা স্পষ্ট করে যে, বাংলাদেশের সড়ক নিরাপত্তা সংকট মোকাবিলায় বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন একটি কার্যকর, বিজ্ঞানভিত্তিক ও সমন্বিত সড়ক নিরাপত্তা কাঠামো।
সড়ক দুর্ঘটনা ঘটলেই সাধারণত চালকের বেপরোয়া গতি, অসতর্কতা কিংবা ট্রাফিক আইন না মানাকে প্রধান কারণ হিসেবে সামনে আনা হয়। চালকের আচরণ অবশ্যই দুর্ঘটনার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। কিন্তু একটি দুর্ঘটনা কেবল চালকের ভুলের ফল নয়।
যানবাহনের যান্ত্রিক ত্রুটি, সড়কের নকশা ও অবস্থা, অপর্যাপ্ত সড়কবাতি, পথচারীদের নিরাপদ পারাপারের অভাব, অবৈধ পার্কিং, ফুটপাত দখল, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, অতিরিক্ত গতি এবং আইন প্রয়োগের দুর্বলতা—সবকিছু মিলেই একটি ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক পরিবেশ তৈরি করে।
অর্থাৎ, সড়ক নিরাপত্তাকে একটি সমন্বিত ‘সিস্টেম’ হিসেবে দেখতে হবে। নিরাপদ গতি, নিরাপদ সড়ক অবকাঠামো, নিরাপদ যানবাহন, নিরাপদ সড়ক ব্যবহার এবং দুর্ঘটনার পর দ্রুত জরুরি সেবা—এই বিষয়গুলোকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করেই একটি কার্যকর নিরাপদ সড়কব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।
বাংলাদেশে সড়ক পরিবহণ আইন, ২০১৮ রয়েছে। এই আইনটি নিরাপদ সড়ক পরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে প্রণয়ন করা হয়েছে এবং এতে মোটরযান নিবন্ধন, ড্রাইভিং লাইসেন্সসহ সড়ক পরিবহনের বিভিন্ন বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
তবে সড়ক নিরাপত্তা শুধু একটি পরিবহন আইন দিয়ে নিয়ন্ত্রিত হওয়ার বিষয় নয়। এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত রয়েছে সড়ক নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ, নগর পরিকল্পনা, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, পুলিশি আইন প্রয়োগ, যানবাহনের ফিটনেস, চালকের প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্যসেবা, জরুরি উদ্ধার, স্থানীয় সরকার এবং পথচারী ব্যবস্থাপনা।
ফলে প্রয়োজন এমন একটি সমন্বিত কাঠামো, যেখানে কে কী করবে, কোন প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব কোথায়, কোথায় জবাবদিহি থাকবে এবং কোনো ব্যর্থতার ক্ষেত্রে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে—তা সুস্পষ্টভাবে নির্ধারিত থাকবে।
সমন্বিত সড়ক নিরাপত্তা আইন বলতে শুধু নতুন একটি আইন প্রণয়নকে বোঝায় না। বরং বিদ্যমান আইন, বিধিমালা ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বের মধ্যে কোথায় সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে, তা চিহ্নিত করে একটি কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক কাঠামো তৈরি করাই এর মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত।
সড়ক নিরাপত্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো দক্ষ চালক। শুধু লিখিত বা ব্যবহারিক পরীক্ষার মাধ্যমে লাইসেন্স দেওয়ার পর দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। চালকের প্রশিক্ষণ, বাস্তব দক্ষতা, দৃষ্টিশক্তি ও স্বাস্থ্যগত সক্ষমতা, ট্রাফিক আইন সম্পর্কে জ্ঞান এবং নিরাপদ চালনার মানসিকতা নিশ্চিত করা জরুরি।
বিশেষ করে পেশাদার চালকদের দীর্ঘ কর্মঘণ্টা ও পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। দীর্ঘ সময় গাড়ি চালালে ক্লান্তি ও মনোযোগের ঘাটতি তৈরি হয়। তাই সমন্বিত সড়ক নিরাপত্তা কাঠামোয় চালকদের কর্মঘণ্টা, বাধ্যতামূলক বিশ্রাম, নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব এবং নিয়মিত প্রশিক্ষণের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।
নিরাপদ সড়কের জন্য নিরাপদ যানবাহন অপরিহার্য। ব্রেক, টায়ার, স্টিয়ারিং, লাইট, দরজা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ ত্রুটিপূর্ণ থাকলে একটি যানবাহন নিজেই চলন্ত ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে।
তাই যানবাহনের ফিটনেস পরীক্ষাকে আরও স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও প্রযুক্তিনির্ভর করা প্রয়োজন। কোনো যানবাহন নিরাপত্তার ন্যূনতম মান পূরণ না করলে সেটিকে সড়কে চলাচলের অনুমতি দেওয়া উচিত নয়। একই সঙ্গে ফিটনেস পরীক্ষায় অনিয়ম হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে।
সড়ক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে গতি ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্ধারিত গতিসীমা থাকলেও বাস্তবে তা কতটা মানা হচ্ছে, সেটি কার্যকরভাবে পর্যবেক্ষণ না করলে কেবল সাইনবোর্ড দিয়ে নিরাপদ গতি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
স্কুল, হাসপাতাল, বাজার, আবাসিক এলাকা, ব্যস্ত মোড় এবং পথচারী-অধ্যুষিত এলাকায় ঝুঁকি বিবেচনায় গতিসীমা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে স্পিড ক্যামেরা, স্বয়ংক্রিয় নজরদারি এবং প্রযুক্তিনির্ভর আইন প্রয়োগের ব্যবস্থা কার্যকর করা জরুরি।
নিরাপদ গতির ব্যবস্থা দুর্ঘটনার সম্ভাবনা কমানোর পাশাপাশি দুর্ঘটনা ঘটলে আঘাতের তীব্রতাও কমাতে পারে। তাই গতি নিয়ন্ত্রণকে সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থার একটি কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
বাংলাদেশের সড়ক ব্যবস্থায় সবচেয়ে অবহেলিত ব্যবহারকারীদের অন্যতম পথচারী। ফুটপাত দখল, অবৈধ পার্কিং, অনিরাপদ রাস্তা পারাপার, পর্যাপ্ত জেব্রা ক্রসিংয়ের অভাব এবং পথচারীবান্ধব অবকাঠামোর ঘাটতি তাদের প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।
তাই সমন্বিত সড়ক নিরাপত্তা কাঠামোয় ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা, নিরাপদ জেব্রা ক্রসিং, পথচারী সংকেত, পর্যাপ্ত সড়কবাতি, নিরাপদ বাসস্টপ এবং স্কুল ও হাসপাতাল এলাকায় বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে বাধ্যতামূলক করার বিষয় বিবেচনা করা প্রয়োজন।
সড়ক পরিকল্পনায় পথচারীকে প্রাধান্য না দিলে নিরাপদ সড়কব্যবস্থা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
বাংলাদেশে মোটরসাইকেলের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে এবং এর সঙ্গে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে। ২০২৫ সালে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় বিপুলসংখ্যক মানুষের মৃত্যু সড়ক নিরাপত্তার জন্য একটি বড় সতর্কসংকেত।
মোটরসাইকেল চালকদের প্রশিক্ষণ, কার্যকর লাইসেন্সিং, মানসম্মত হেলমেট ব্যবহার, গতিসীমা মেনে চলা এবং ঝুঁকিপূর্ণ চালনা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি তরুণ চালকদের নিরাপদ চালনায় বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন।
মোটরসাইকেল নিরাপত্তাকে সাধারণ সড়ক নিরাপত্তা কর্মসূচির একটি ছোট অংশ হিসেবে না দেখে আলাদা গুরুত্ব দিয়ে পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি।
বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান নিয়ে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের তথ্যের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। এর অন্যতম কারণ তথ্য সংগ্রহের উৎস ও পদ্ধতির ভিন্নতা।
বিআরটিএ নিয়মিত সড়ক দুর্ঘটনার প্রতিবেদন প্রকাশ করে এবং তাদের নিজস্ব প্রশাসনিক তথ্যব্যবস্থা রয়েছে। অন্যদিকে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন সংবাদমাধ্যম ও নিজস্ব উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ করে। ফলে দুই প্রতিষ্ঠানের পরিসংখ্যানে পার্থক্য থাকা অস্বাভাবিক নয়।
তবে এই পার্থক্যই প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশে একটি কেন্দ্রীয়, নির্ভরযোগ্য ও সমন্বিত জাতীয় সড়ক দুর্ঘটনা ডেটাবেজ গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি।
এই ডেটাবেজে দুর্ঘটনার স্থান, সময়, রাস্তার ধরন, যানবাহনের ধরন, চালকের তথ্য, নিহত ও আহতের সংখ্যা, দুর্ঘটনার সম্ভাব্য কারণ, আবহাওয়া, রাস্তার অবস্থা এবং দুর্ঘটনার পর চিকিৎসার তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।
এর মাধ্যমে দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থান বা ‘ব্ল্যাক স্পট’ শনাক্ত করা, সড়ক নিরাপত্তা অডিট পরিচালনা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী প্রকৌশলগত ব্যবস্থা গ্রহণ সহজ হবে।
দুর্ঘটনার পর শুধু মামলা ও শাস্তি নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয়। প্রতিটি গুরুতর দুর্ঘটনা থেকে শিক্ষা নিতে হবে।
কেন দুর্ঘটনা ঘটল, সেখানে রাস্তার নকশাগত সমস্যা ছিল কি না, গতিসীমা যথাযথ ছিল কি না, যানবাহনের ফিটনেস ছিল কি না কিংবা চালকের কর্মঘণ্টা অতিরিক্ত ছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে।
প্রতিটি বড় দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে স্বাধীন ও বৈজ্ঞানিক দুর্ঘটনা তদন্ত এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সড়ক নিরাপত্তা অডিট চালু করা গেলে দুর্ঘটনার মূল কারণ শনাক্ত করে ভবিষ্যতে একই ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।
অর্থাৎ, দুর্ঘটনার পর শুধু অপরাধী খোঁজার পরিবর্তে দুর্ঘটনা কেন ঘটল এবং ভবিষ্যতে কীভাবে তা প্রতিরোধ করা যায়—সেদিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
সড়ক নিরাপত্তার অর্থ শুধু দুর্ঘটনা প্রতিরোধ নয়; দুর্ঘটনা ঘটলে আহত ব্যক্তিকে দ্রুত ও কার্যকর চিকিৎসা দেওয়া নিশ্চিত করাও এর অংশ।
দুর্ঘটনাস্থলে দ্রুত উদ্ধার, প্রশিক্ষিত ফার্স্ট রেসপন্ডারের মাধ্যমে প্রাথমিক চিকিৎসা, কার্যকর অ্যাম্বুলেন্স ব্যবস্থা, হাসপাতালভিত্তিক ট্রমা কেয়ার এবং জরুরি যোগাযোগব্যবস্থা একটি সমন্বিত সড়ক নিরাপত্তা কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া উচিত।
দুর্ঘটনার পরের কয়েক মিনিট অনেক ক্ষেত্রে জীবন ও মৃত্যুর ব্যবধান তৈরি করে। তাই দুর্ঘটনা-পরবর্তী জরুরি সেবাকে সড়ক নিরাপত্তা নীতির বাইরে রাখার সুযোগ নেই।
আইন যতই ভালো হোক, তার প্রয়োগ দুর্বল হলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া সম্ভব নয়। সড়ক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগ হতে হবে ধারাবাহিক, নিরপেক্ষ এবং প্রযুক্তিনির্ভর।
গুরুতর ট্রাফিক অপরাধের ক্ষেত্রে ডিজিটাল প্রমাণ, ক্যামেরা, স্বয়ংক্রিয় নম্বরপ্লেট শনাক্তকরণ এবং ইলেকট্রনিক জরিমানার মতো ব্যবস্থা কার্যকর করা যেতে পারে।
একই সঙ্গে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, পরিবহন কর্তৃপক্ষ এবং সড়ক ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর তথ্য আদান-প্রদানের ব্যবস্থা থাকতে হবে।
আইন ভঙ্গের ক্ষেত্রে শুধু চালক নয়, দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও কর্তৃপক্ষের জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে।
সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু সরকার বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থা একা সফল হতে পারবে না। পরিবহন মালিক-শ্রমিক, চালক, যাত্রী, পথচারী, শিক্ষার্থী, স্থানীয় সরকার, নাগরিক সমাজ, গবেষক, গণমাধ্যম এবং বেসরকারি খাত—সব পক্ষের অংশগ্রহণ প্রয়োজন।
আইন বা নীতিমালা প্রণয়নের আগে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত গ্রহণ এবং বাস্তব পরিস্থিতির ভিত্তিতে পরিকল্পনা তৈরি করা জরুরি। একই সঙ্গে আইন বাস্তবায়নের অগ্রগতি পরিমাপের জন্য নির্দিষ্ট সূচক, সময়সীমা এবং জবাবদিহির ব্যবস্থা থাকতে হবে।
বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা কমানোর জন্য বিভিন্ন সময়ে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সড়ক পরিবহণ আইন, ২০১৮ কার্যকর রয়েছে এবং বিআরটিএ নিয়মিত দুর্ঘটনা-সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ করছে। কিন্তু দুর্ঘটনার সামগ্রিক চিত্র, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব, নিরাপদ অবকাঠামো, চালক ও যানবাহনের নিরাপত্তা, গতি নিয়ন্ত্রণ, পথচারীর সুরক্ষা এবং দুর্ঘটনা-পরবর্তী চিকিৎসাকে একই কাঠামোর মধ্যে আনতে আরও শক্তিশালী সমন্বয় প্রয়োজন।
সড়ক দুর্ঘটনাকে ‘স্বাভাবিক’ বা ‘অনিবার্য’ ঘটনা হিসেবে মেনে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। প্রতিটি দুর্ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে ঝুঁকি কমানোর ব্যবস্থা করতে হবে।
চালকের ভুলের জন্য যেমন জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে, তেমনি ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন অনুমোদন, ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক নকশা, অনিরাপদ গতি ব্যবস্থাপনা কিংবা আইন প্রয়োগের ব্যর্থতার ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
সড়ক নিরাপত্তা শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবন রক্ষার প্রশ্ন। একটি নিরাপদ সড়ক মানে শুধু দুর্ঘটনা কমানো নয়; এর অর্থ হলো একটি শিশুর নিরাপদে স্কুলে যাওয়া, একজন শ্রমজীবী মানুষের নিরাপদে কর্মস্থলে পৌঁছানো, একজন বৃদ্ধের নিরাপদে রাস্তা পার হওয়া এবং একটি পরিবারের প্রিয়জনের সুস্থভাবে ঘরে ফিরে আসা।
তাই বাংলাদেশের জন্য এখন প্রয়োজন বিচ্ছিন্ন আইন ও বিচ্ছিন্ন উদ্যোগের পরিবর্তে একটি কার্যকর, বিজ্ঞানভিত্তিক, তথ্যনির্ভর, সমন্বিত ও জবাবদিহিমূলক সড়ক নিরাপত্তা কাঠামো। সেই কাঠামোর কেন্দ্রে থাকতে হবে মানুষের জীবন এবং বিশেষভাবে পথচারী, শিশু, মোটরসাইকেল আরোহীসহ সব ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক ব্যবহারকারীর নিরাপত্তা।
সড়ক নিরাপত্তা কোনো বিলাসিতা নয়; এটি নাগরিকের জীবন ও নিরাপত্তার অধিকার। নিরাপদ সড়কের জন্য তাই এখনই প্রয়োজন কার্যকর আইন, শক্তিশালী প্রয়োগ, নির্ভরযোগ্য তথ্যব্যবস্থা এবং সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ। মোঃ বজলুর রহমান
সহযোগী অধ্যাপক
ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (ডিআইইউ)
সফরা জাহান, প্রজেক্ট অফিসার (DIU)

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না.