বেপরোয়া গতি থেকে বাড়ছে প্রাণহানি: প্রয়োজন সড়ক নিরাপত্তা আইন
মোঃ বজলুর রহমান, সফরা জাহান: বাংলাদেশের সড়কে প্রতিদিনই ঘটছে দুর্ঘটনা, আহত ও প্রাণহানির ঘটনা। এসব দুর্ঘটনার পেছনে চালকের ভুল, বেপরোয়া ও অতিরিক্ত গতি, ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক অবকাঠামো, যানবাহনের ত্রুটি, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং আইন প্রয়োগের ঘাটতিসহ নানা কারণ ভূমিকা রাখে। তবে একটি দুর্ঘটনা কতটা ভয়াবহ হবে, তা নির্ধারণে গতির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক ক্ষেত্রে যে দুর্ঘটনা থেকে মানুষ বেঁচে যেতে পারত, অতিরিক্ত গতি সেটিকেই প্রাণঘাতী করে তোলে।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে ৭ হাজার ৫৮৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ হাজার ৩৫৯ জন নিহত এবং ১৬ হাজার ৪৭৬ জন আহত হয়েছেন। একই বছরে ৩ হাজার ২৯টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ২ হাজার ৬৭১ জন। এই পরিসংখ্যান শুধু সংখ্যার হিসাব নয়; এটি দেশের সড়ক ব্যবস্থাপনা, চালকের আচরণ এবং আইন প্রয়োগের কার্যকারিতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, যানবাহনের গতি দুর্ঘটনা ঘটার ঝুঁকি, দুর্ঘটনার সময় আঘাতের তীব্রতা এবং মৃত্যুর সম্ভাবনা—সবকিছুকে সরাসরি প্রভাবিত করে। অর্থাৎ গতি নিয়ন্ত্রণ শুধু ট্রাফিক আইন মেনে চলার বিষয় নয়; এটি জীবন রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, কোনো পথচারী ঘণ্টায় ৮০ কিলোমিটার গতিতে চলা গাড়ির ধাক্কায় পড়লে, ঘণ্টায় ৪৮ কিলোমিটার গতির গাড়ির তুলনায় তার মৃত্যুর ঝুঁকি প্রায় তিন গুণ বেশি হতে পারে। একইভাবে, গড় যানবাহনের গতি মাত্র ৫ শতাংশ কমানো গেলে প্রাণহানি প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব হতে পারে।
বাংলাদেশে গতিসীমা নির্ধারণের জন্য আইনি কাঠামো রয়েছে। সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর ৪৪ ধারায় বিভিন্ন ধরনের সড়ক ও মহাসড়কের জন্য মোটরযানের গতিসীমা নির্ধারণ বা পুনর্নির্ধারণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত গতিসীমার বেশি গতিতে কিংবা বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালানোও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ ২০২৪ সালে ‘মোটরযান গতিসীমা নির্দেশিকা’ প্রকাশ করেছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—গতিসীমা নির্ধারণের পর তা বাস্তবে কতটা কার্যকরভাবে মানা হচ্ছে? কেবল সড়কের পাশে সর্বোচ্চ গতিসীমার সাইনবোর্ড স্থাপন করলেই কার্যকর গতি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত হয় না। এর জন্য প্রয়োজন নিয়মিত গতি পরিমাপ, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, আইনভঙ্গের কার্যকর শাস্তি এবং চালকের জবাবদিহি।
সব সড়ক বা একটি সড়কের সব অংশের জন্য একই গতিসীমা নির্ধারণ বাস্তবসম্মত নয়। মহাসড়কের খোলা অংশ, ব্যস্ত বাজার, আবাসিক এলাকা, স্কুলের সামনে, হাসপাতালের প্রবেশপথ কিংবা ঘনবসতিপূর্ণ শহুরে এলাকার ঝুঁকি এক নয়। ফলে এসব স্থানে গতিসীমাও এক হওয়া উচিত নয়।
বাংলাদেশে তাই ঝুঁকিভিত্তিক গতি ব্যবস্থাপনা চালু করা জরুরি। সড়কের নকশা, পথচারীর সংখ্যা, স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল, বাজার, আবাসিক এলাকা, মোড়, বাসস্টপ এবং দুর্ঘটনার ইতিহাস বিবেচনায় নিয়ে নির্দিষ্ট সড়কাংশে আলাদা গতিসীমা নির্ধারণ করতে হবে। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে, যেখানে মোটরযান ও পথচারীর চলাচল একসঙ্গে বেশি, সেখানে নিরাপদ গতি কম রাখতে হবে।
শিশুদের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আশপাশে নির্দিষ্ট স্কুল সেফটি জোন চালু করা প্রয়োজন। এসব এলাকায় ঘণ্টায় ৩০ কিলোমিটার বা পরিস্থিতি অনুযায়ী আরও কম গতিসীমা নির্ধারণ করা যেতে পারে।
তবে শুধু গতিসীমা নির্ধারণ করলেই হবে না। এর সঙ্গে প্রয়োজন স্পিড ক্যামেরা, স্পিড হাম্প, উঁচু পথচারী পারাপার, নিরাপদ ফুটপাত এবং স্পষ্ট সাইনেজ।
বাংলাদেশে স্কুলের সামনে প্রায়ই দেখা যায়, একদিকে রাস্তা পার হচ্ছে শিশুরা, অন্যদিকে দ্রুতগতিতে চলছে বাস, ট্রাক, মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ি। সেখানে শুধু ‘সাবধানে চলুন’ লেখা সাইনবোর্ড যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন আইনগতভাবে নির্ধারিত নিরাপদ অঞ্চল, নির্দিষ্ট গতিসীমা এবং কার্যকর নজরদারি। একই ধরনের ব্যবস্থা হাসপাতাল, বাজার এবং অন্যান্য উচ্চ পথচারী চলাচলপূর্ণ এলাকাতেও চালু করা যেতে পারে।
বাংলাদেশে গতি নিয়ন্ত্রণের অন্যতম বড় দুর্বলতা হলো—প্রতিটি সড়কে সব সময় পুলিশি নজরদারি করা সম্ভব নয়। জনবল সীমিত, সড়ক বিস্তৃত এবং যানবাহনের সংখ্যা বিপুল। ফলে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এখন আর বিলাসিতা নয়; এটি প্রয়োজনীয়তা।
এ ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয় স্পিড ক্যামেরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। দুর্ঘটনাপ্রবণ মহাসড়ক, শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল, বাজার এবং পথচারীবহুল এলাকায় ধাপে ধাপে এসব ক্যামেরা স্থাপন করা যেতে পারে।
তবে শুধু ক্যামেরা স্থাপন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন একটি পূর্ণাঙ্গ এনফোর্সমেন্ট চেইন বা কার্যকর আইন প্রয়োগের ধারাবাহিক ব্যবস্থা।
ক্যামেরায় অতিরিক্ত গতি শনাক্ত হওয়ার পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে গাড়ির নম্বর শনাক্ত, ডিজিটাল জরিমানা নোটিশ পাঠানো, জরিমানা পরিশোধের ব্যবস্থা এবং বারবার আইন ভাঙলে লাইসেন্স স্থগিতের মতো কার্যকর পদক্ষেপ থাকতে হবে। বাণিজ্যিক যানবাহনের ক্ষেত্রে মালিক ও অপারেটরের জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে।
শুধু আইন নয়, প্রয়োজন সমন্বিত সড়ক নিরাপত্তা আইন। বাংলাদেশে সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনগত ভিত্তি তৈরি করেছে। কিন্তু সড়ক নিরাপত্তা শুধু যানবাহন ও চালকের আচরণের বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িত সড়ক নির্মাণ ও নকশা, গতি ব্যবস্থাপনা, যানবাহনের নিরাপত্তা, চালকের প্রশিক্ষণ, পথচারী অবকাঠামো, ট্রাফিক পুলিশিং, জরুরি চিকিৎসা এবং দুর্ঘটনার তথ্যব্যবস্থা। তাই একটি কার্যকর ও সমন্বিত সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একটি সমন্বিত সড়ক নিরাপত্তা আইনে জাতীয় গতি ব্যবস্থাপনা কাঠামো, স্কুল-কলেজ ও হাসপাতাল এলাকায় বিশেষ নিরাপদ গতি অঞ্চল, স্পিড ক্যামেরা ও ডিজিটাল ট্রাফিক আইন প্রয়োগ, নতুন সড়ক নির্মাণের আগে ও পরে বাধ্যতামূলক রোড সেফটি অডিট, দুর্ঘটনার তথ্যভাণ্ডার এবং দ্রুত দুর্ঘটনা-পরবর্তী চিকিৎসার বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।
শুধু চালককে দায়ী করলেই সড়ক নিরাপদ হবে না। সড়কের নকশা যদি ঝুঁকিপূর্ণ হয়, পথচারীর জন্য নিরাপদ পারাপার না থাকে, বাসস্টপ অনিরাপদ হয়, যানবাহনের ফিটনেস পরীক্ষা দুর্বল থাকে অথবা দুর্ঘটনার পর দ্রুত চিকিৎসা না পাওয়া যায়, তাহলে শুধু ট্রাফিক আইন প্রয়োগ করে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন।
সুইডেনের ভিশন জিরো দর্শনের মূল কথা হলো—সড়ক ব্যবস্থায় কোনো মানুষের মৃত্যু বা গুরুতর আহত হওয়াকে গ্রহণযোগ্য হিসেবে দেখা যাবে না। এই ধারণা মানুষের ভুলের সম্ভাবনাকে অস্বীকার করে না। বরং সড়ক, যানবাহন ও গতিসীমা এমনভাবে পরিকল্পনা করার ওপর গুরুত্ব দেয়, যাতে মানুষের ভুল হলেও তার পরিণতি প্রাণঘাতী না হয়। বাংলাদেশের জন্য এখানেই সবচেয়ে বড় শিক্ষা রয়েছে।
সড়ক দুর্ঘটনাকে শুধু চালকের ভুল হিসেবে দেখলে সমস্যার সমাধান হবে না। সড়কের নকশা, গতিসীমা, যানবাহনের নিরাপত্তা, আইন প্রয়োগ এবং দুর্ঘটনা-পরবর্তী চিকিৎসা—সবকিছুকে একই নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে দেখতে হবে।
এখনই প্রয়োজন নিরাপদ গতি, নিরাপদ সড়ক, নিরাপদ ব্যবস্থা। বাংলাদেশে সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে বিচ্ছিন্ন পদক্ষেপ আর যথেষ্ট নয়। কোথাও স্পিড ক্যামেরা, কোথাও স্পিড ব্রেকার, কোথাও ট্রাফিক অভিযান, আবার কোথাও সচেতনতামূলক প্রচারণা—এভাবে দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
প্রয়োজন একটি জাতীয় সমন্বিত সড়ক নিরাপত্তা কাঠামো, যার কেন্দ্রবিন্দু হবে সেইফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচ বা সমন্বিত নিরাপদ ব্যবস্থা। এর আওতায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনুযায়ী গতিসীমা নির্ধারণ, স্কুল ও হাসপাতাল এলাকায় নিরাপদ গতি অঞ্চল, দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকায় স্পিড ক্যামেরা, ডিজিটাল ট্রাফিক আইন প্রয়োগ, বাধ্যতামূলক রোড সেফটি অডিট, নিরাপদ ফুটপাত ও পথচারী পারাপার, যানবাহনের ফিটনেস ও নিরাপত্তা মান উন্নয়ন, চালকের প্রশিক্ষণ এবং দ্রুত দুর্ঘটনা-পরবর্তী চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে।
২০২৫ সালে ৭ হাজার ৩৫৯ জনের প্রাণহানি এবং ১৬ হাজার ৪৭৬ জন আহত হওয়ার যে চিত্র উঠে এসেছে, তা বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা।
গতিসীমা নির্ধারণের উদ্যোগ আছে, আইন আছে এবং বিভিন্ন সংস্থার দায়িত্বও আছে। এখন প্রয়োজন এসব উদ্যোগকে একটি কার্যকর ও সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে আনা। কারণ শুধু ‘বেপরোয়া গাড়ি চালাবেন না’—এমন প্রচারণা দিয়ে নিরাপদ সড়ক তৈরি করা সম্ভব নয়।
নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে হলে নিরাপদ গতি, নিরাপদ অবকাঠামো, নিরাপদ যানবাহন, দক্ষ চালক, কার্যকর আইন প্রয়োগ এবং দ্রুত দুর্ঘটনা-পরবর্তী চিকিৎসা—সবকিছুকে একই ব্যবস্থার অংশ করতে হবে।
তাই বাংলাদেশের সড়ক নিরাপত্তার পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হওয়া উচিত একটি কার্যকর, বিজ্ঞানভিত্তিক, তথ্যনির্ভর ও সমন্বিত সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন, যেখানে গতি ব্যবস্থাপনা হবে অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। কারণ শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু কত কিলোমিটার গতিতে গাড়ি চলছে—তা নয়; প্রশ্ন হলো, সেই গতিতে একজন মানুষ বেঁচে থাকার কতটা সুযোগ পাচ্ছেন।
মোঃ বজলুর রহমান
সহযোগী অধ্যাপক
ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (ডিআইইউ)
সফরা জাহান, প্রজেক্ট অফিসার(DIU)