পিরোজপুরে প্রযুক্তির সহায়তায় জেন্ডার ভিত্তিক সহিংসতা (টিএফজিবিভি) প্রতিরোধে আইনি সহায়তা বিষয়ক পরামর্শ সভা
নিজস্ব প্রতিনিধি পিরোজপুর : ডিজিটাল রূপান্তরের যুগে প্রযুক্তির সহায়তায় জেন্ডার ভিত্তিক সহিংসতা (টিএফজিবিভি) একটি ক্রমবর্ধমান সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা বিশেষ করে নারীরা এবং কন্যা শিশুরা অধিকভাবে সম্মুখীন হচ্ছে। ইউএনএফপিএ-এর তথ্যমতে, পৃথিবীজুড়ে প্রতি তিনজনে দুইজন নারী টেকনোলজি-সুবিধাভোগী জেন্ডার ভিত্তিক সহিংসতার শিকার হন, এবং বাংলাদেশে এই হার ৮৯%।
এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে, আজ পিরোজপুরে বাংলাদেশ এনজিওস নেটওয়ার্ক ফর রেডিও এন্ড কমিউনিকেশন (বিএনএনআরসি) এবং পিরোজপুর গণউন্নয়ন সমিতি (পিজিইউএস) যৌথভাবে এক আইনী পরামর্শ সভার আয়োজন করে। এই পরামর্শ সভায় বিভিন্ন সেক্টর থেকে প্রতিনিধিবৃন্দ অংশগ্রহণ করেন, যার মধ্যে ছিলেন জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার, উপ-পরিচালক সমাজসেবা অধিদপ্তর পিরোজপুর, সহকারী তথ্য কর্মকর্তা, আইন সহায়তা প্রদানকারী আইনজীবীবৃন্দ, পাবলিক প্রসিকিউটর, প্যানেল আইনজীবী, নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা প্রতিরোধ জেলা কমিটির সদস্য, ব্লাস্ট আইনজীবী, মানবাধিকার জোটের সদস্য, কেবল অপারেটর, প্রতিনিধি, কলেজ শিক্ষক সমিতি, আইনজীবী সমিতি ইন্টারনেট পরিষেবা প্রদানকারী সমিতির সদস্য, স্থানীয় সংবাদপত্র সম্পাদক এবং মিডিয়া প্রতিনিধি, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ প্রতিনিধি, মানবাধিকার কর্মী এবং নারী-নেতৃত্বাধীন এনজিও প্রতিনিধি, সাংস্কৃতিক সংগঠন, স্থানীয় শিক্ষাবিদ, যুব প্রতিনিধিবৃন্দ অংশগ্রহণ করেন।
পরামর্শ সভার উদ্দেশ্য ছিলো জেলা পর্যায়ের আইনি সহায়তা কর্মকর্তা এবং বেসরকারি আইনি সহায়তা সংস্থাগুলির কার্যক্রমে টিএফজিবিভি বিষয়গুলোকে একীভূত করা। টিএফজিবিভি প্রতিরোধে সক্রিয় পদক্ষেপ গ্রহণে আইনি সহায়তা প্রদানকারী আইনজীবী এবং নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ জেলা কমিটির সদস্যদের কাজে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি। নাগরিক সমাজ সংগঠন, সরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সংলাপ এবং সহযোগিতা বৃদ্ধি করা। রেফারেল সিস্টেম প্রতিষ্ঠা এবং ভুক্তভোগীদের জন্য আইনি সহায়তা পরিষেবা নেয়ার ক্ষেত্রে ক্ষেত্রে জেলা পর্যায়ের আইনি সহায়তা কর্মকর্তা এবং সংস্থাগুলির ভূমিকাকে উৎসাহিত এবং শক্তিশালী করা।
এ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পিরোজপুর জেলার লিগ্যাল এইড অফিসার ও সিনিয়র সিভিল জজ মো. রিয়াদ হাসান। এ পরামর্শ সভা ‘স্ট্রেনথেনিং রেজিলিয়েন্স এগেইনস্ট টেকনোলজি-ফেসিলিটেটেড জেন্ডার-বেইসড ভায়োলেন্স (টিএফজিবিভি) এন্ড প্রমোটিং ডিজিটাল ডেভেলপমেন্ট’ প্রকল্পের অংশ হিসেবে অনুষ্ঠিত হয়, যা নাগরিকতা: সিভিক এনগেজমেন্ট ফান্ড (সিইএফ) কর্মসূচির অধীনে বাস্তবায়িত হচ্ছে। এই প্রকল্পটির কারিগরি সহায়তা প্রদান করছে জিএফএ কনসালটিং গ্রুপ এবং অর্থায়ন করছে সুইজারল্যান্ড এবং গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কানাডা।
সভার শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন পিরোজপুর গণউন্নয়ন সমিতির নির্বাহী পরিচালক, জিয়াউল আহসান, তিনি অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্য এবং প্রত্যাশিত ফলাফল সম্পর্কে অংশগ্রহণকারীদের অবহিত করেন। তিনি সহিংসতার বিস্তৃতি, আইনি প্রতিক্রিয়ার সীমাবদ্ধতা, তথ্য ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি এবং নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যানের অভাবের বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি পিরোজপুরের স্থানীয় চিত্র, অগ্রগতি এবং সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেন এবং পিরোজপুরে পরিবর্তনের জন্য সংক্ষিপ্ত নীতিগত সুপারিশ তুলে ধরেন।
বিএনএনআরসি’র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, এ এইচ এম বজলুর রহমান, প্রযুক্তির সহায়তায় জেন্ডার ভিত্তিক সহিংসতা (টিএফজিবিভি) এবং ডিজিটাল ডেভেলপমেন্ট সম্পর্কিত ধারণা, ধরন, নেতিবাচক প্রভাব এবং কর্তব্য বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। তিনি কর্মশালার উদ্দেশ্য ও প্রত্যাশিত ফলাফল সম্পর্কে অংশগ্রহণকারীদের অবহিত করেন এবং ডিজিটাল ডেভেলপমেন্ট ও প্রযুক্তির সহায়তায় জেন্ডার ভিত্তিক সহিংসতার বিভিন্ন পরিসংখ্যান ও ভয়াবহতা সম্পর্কে আলোচনা করেন।
এ অনুষ্ঠানে ১৬ জন ডেজিগনেটেড স্পিকার আলোচনা করেন এবং অন্যান্য অংশগ্রহণকারীরা মুক্ত আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন। আলোচনায় সাইবার আদালতের বিচার প্রক্রিয়া, সাইবার আইন সম্পর্কে ধারণা দেওয়া, পরিবার ও স্কুল-কলেজ পর্যায় ও কমিউনিটি পর্যায়ে সচেতনতা সৃষ্টি, ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সাইবার অপরাধের তদন্ত প্রক্রিয়া সহজ করা, প্যারেন্টাল কন্ট্রোল, অনলাইন আসক্তি ত্যাগ করা, কাঙ্ক্ষিত সেবার মান উন্নয়ন, সাইবার ক্রাইমের শিকার ব্যক্তিদের দালিলিক প্রমাণ সংরক্ষণের উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। প্রযুক্তির মাধ্যমে সহিংসতা প্রতিরোধের জন্য বিভিন্ন সচেতনতামূলক কার্যক্রম যেমন টিএফজিবিভি-র ধরন, প্রতিরোধ, প্রশমন ও করণীয় সম্পর্কে নিজেদের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
ইকবাল কবির, উপ-পরিচালক সমাজসেবা অধিদপ্তর পিরোজপুর, সাইফুল্লাহ আল মাদানী, সহকারী পরিচালক গণয়োগাযোগ অধিদপ্তর, পিরোজপুর বিজ্ঞান প্রযুক্তি শ্বিবিদ্যালয়ের ডিন ও সহযোগী অধ্যাপক, মো. আক্তার হোসেন ও অন্যান্য অতিথিবৃন্দ ডিজিটাল ডেভেলপমেন্ট এবং টিএফজিবিভি বিষয়ে জনসচেতনতায় জোর দেন এবং সরকারের কার্যকর উদ্যোগ ‘পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন’ হেল্পলাইন (০১৩২০০০০৮৮৮) ও ইমেইল ([email protected]) সম্পর্কে আলোচনা করেন। তারা সচেতনতার মাধ্যমে সহিংসতা কমানোর এবং একটি নিরাপদ, অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
প্রধান অতিথি, পিরোজপুর জেলার লিগ্যাল এইড অফিসার ও সিনিয়র সিভিল জজ মো. রিয়াদ হাসান প্রাথমিক শিকার হিসেবে নারী ও মহিলা শিক্ষার্থীরা যে বেশি দুর্ভোগের শিকার তা উল্লেখ করেন। তিনি স্বীকার করেন যে পুরুষরাও টিএফজিবিভি-এর শিকার হতে পারে, তিনি কার্যকরভাবে মোকাবেলা করার জন্য নীতিনির্ধারক, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং সকলকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান। প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডার-ভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধে এই সহিংসতার মাত্রা ও নতুন নতুন ফর্মের কথা উল্লেখ করেন। তিনি ভুক্তভোগীদের আইনি পরামর্শ নিতে স্থানীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং কর্তৃপক্ষের কাছে ঘটনাগুলি রিপোর্ট করার আহবান জানান। টিএফজিবিভি কার্যকরভাবে মোকাবেলা করার জন্য আমাদের সকলের নিজ নিজ জায়গা থেকে সক্রিয়ভাবে কাজ করতে হবে।
জেলা পর্যায়ের এই পরামর্শ সভা থেকে সমাজের প্রতিনিধিরা টিএফজিবিভি সম্পর্কে সচেতনতা লাভ করেছেন, নাগরিক সমাজ এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় জোরদার করার ক্ষেত্রে এই পরামর্শ সভা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করবে। টিএফজিবিভি মোকাবেলায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে পারবেন।