কুষ্টিয়ায় প্রযুক্তির সহায়তায় জেন্ডার ভিত্তিক সহিংসতা (টিএফজিবিভি) প্রতিরোধে কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের ভূমিকা
নিজস্ব প্রতিনিধি : ডিজিটাল রূপান্তরের যুগে প্রযুক্তির সহায়তায় জেন্ডার ভিত্তিক সহিংসতা (টিএফজিবিভি) একটি ক্রমবর্ধমান সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা বিশেষ করে নারীরা এবং কন্যা শিশুরা অধিকভাবে সম্মুখীন হচ্ছে। ইউএনএফপিএ-এর তথ্যমতে, পৃথিবীজুড়ে প্রতি তিনজনে দুইজন নারী প্রযুক্তির সহায়তায় জেন্ডার ভিত্তিক সহিংসতার শিকার হন, এবং বাংলাদেশে এই হার ৮৯%। একই সূত্রমতে, এরকম সহিংসতার শিকার ৭৫ শতাংশ নারীরাই পারিবারিক ও সামাজিক চাপের কারণে আইনি সহায়তা গ্রহণ করেন না।
এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে, এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রমে বর্তমান সমাজের অন্যতম বার্তা প্রদানকারী-ডিজিটাল কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের যুক্ত করতে, আজ কুষ্টিয়ায় বাংলাদেশ এনজিওস নেটওয়ার্ক ফর রেডিও এন্ড কমিউনিকেশন (বিএনএনআরসি) এবং সেতু যৌথভাবে কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্য একটি অবহিতকরণ সভার আয়োজন করে। এই অবহিতকরণ সভায় বিভিন্ন সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মের মোট ৩১ জন কন্টেন্ট ক্রিয়েটরেরা অংশগ্রহণ করেন।
কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্য এই অবহিতকরণ সভার উদ্দেশ্য ছিলো জেলা পর্যায়ের বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মের কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডার ভিত্তিক সহিংসতা এবং ডিজিটাল উন্নয়ন প্রচারণা বিষয়ে অবহিত করা, তাদের নিয়মিত কন্টেন্টের পাশাপাশি টিএফজিবিভি প্রতিরোধ ও প্রশমন বিষয়ক বার্তা ও কন্টেন্ট তৈরী, এবং কন্টেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবে সুষ্ঠু আচরণ বিধি ও নৈতিক মানদণ্ড মেনে কন্টেন্ট তৈরীর উৎসাহ প্রদান।
এ অবহিতকরণ সভা বিএনএনআরসি-এর ‘স্ট্রেনদেনিং রেজিলিয়েন্স এগেইনস্ট টেকনোলজি-ফেসিলিটেটেড জেন্ডার-বেইসড ভায়োলেন্স (টিএফজিবিভি) এন্ড প্রমোটিং ডিজিটাল ডেভেলপমেন্ট’ প্রকল্পের অংশ হিসেবে আয়োজন করা হয়, যা নাগরিকতা: সিভিক এনগেজমেন্ট ফান্ড (সিইএফ) কর্মসূচির অধীনে বাস্তবায়িত হচ্ছে। বিএনএনআরসি’র এই প্রকল্পটির কারিগরি সহায়তা প্রদান করছে জিএফএ কনসালটিং গ্রুপ এবং অর্থায়ন করছে সুইজারল্যান্ড, গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন।
সভার শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন সেতু’র কোঅর্ডিনেটর মোছা. নাজমুন্নাহার। এসময় তিনি বর্তমান সমাজে বার্তা প্রদানে কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের গুরুত্ব, এবং টিএফজিবিভির মতো গুরুতর সামাজিক সমস্যা প্রতিরোধে তাদের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করেন।
বিএনএনআরসি-র প্রোগ্রাম কোর্ডিনেটর, হীরেন পণ্ডিত, প্রযুক্তির সহায়তায় জেন্ডার ভিত্তিক সহিংসতা (টিএফজিবিভি) এবং ডিজিটাল ডেভেলপমেন্ট সম্পর্কিত ধারণা, ধরন, নেতিবাচক প্রভাব এবং কর্তব্য বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। তিনি ডিজিটাল ডেভেলপমেন্ট ও প্রযুক্তির সহায়তায় জেন্ডার ভিত্তিক সহিংসতার বিভিন্ন পরিসংখ্যান ও ভয়াবহতা সম্পর্কে আলোচনা করেন। টিএফজিবিভি এর কুষ্টিয়ার বর্তমান অবস্থা ও স্থানীয় প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন সঞ্জয় কুমার বিশ্বাস।
অনুষ্ঠানে ডিজিটাল কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্য আদর্শ আচরণ এবং নৈতিক মানদণ্ড নিয়েও আলোচনা হয়। এ আলোচনা শেষে উপস্থিত কন্টেন্ট ক্রিয়েটোরেরা মুক্ত আলোচনায় অংশ নেয় এবং টিএফজিবিভি প্রতিরোধ ও প্রশমনে স্ব-স্ব কন্টেন্টের মাধ্যমে করণীয় সম্পর্কে মতামত প্রদান করেন। অংশগ্রহণকারীরা মুক্ত আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন। তাঁরা প্রযুক্তির মাধ্যমে সহিংসতা প্রতিরোধের জন্য বিভিন্ন সচেতনতামূলক কার্যক্রম যেমন টিএফজিবিভি-র ধরন, প্রতিরোধ, প্রশমন ও করণীয় সম্পর্কে নিজেদের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
পাশাপাশি টিএফজিবিভি প্রতিরোধ ও প্রশমনে সকল পক্ষের করণীয় সম্পর্কেও বিস্তারিত আলোচনা করা হয় এবং অংশগ্রহণকারীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই আলোচনায় যুক্ত হন। তারা টিএফজিবিভি প্রতিরোধ ও প্রশমনে কন্টেন্ট তৈরি করবেন এবং অন্যান্য পর্যায়ে সক্রিয়ভাবে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। একইসাথে, সেশনে প্রাপ্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো আরও বড় পরিসরে-বিশেষ করে পরিবার, বন্ধু-বান্ধব এবং সহকর্মীদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
আলোচকগণ ও অংশগ্রহণকারী সকলেই ডিজিটাল ডেভেলপমেন্ট এবং টিএফজিবিভি বিষয়ে জনসচেতনতায় জোর দেন এবং সরকারের কার্যকর উদ্যোগ ‘পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন’ হেল্পলাইন (01320000888) ও ইমেইল ([email protected]) সম্পর্কে আলোচনা করেন।
সভায় সম্মানিত অতিথিবৃন্দ জনপ্রিয় কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের তৈরির উপর গুরুত্ব আরোপ করেন। তাঁরা মানসম্পন্ন কন্টেন্টের চাইতেও আকর্ষণীয় থাম্বনেইল এবং চটকদার বিষয়ের ওপর মনোযোগ দিচ্ছে বেশী এ বিষয়ে লক্ষ্য রাখতে হবে। উপস্থিত সবাইকে আরও শালীন এবং সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে এমন বিষয়ে কন্টেন্ট তৈরি করার উপর জোর দেন।
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইসিটি বিভাগের অধ্যাপক ড. পরেশ চন্দ্র বর্মণ বলেন, বর্তমানের মানুষ আবেগ প্রতিবন্ধী হয়ে পড়ছে। কারণ একই সময় ফেসবুকে কখনও খুশির ঘটনায় আনন্দের কমেন্টস করছে আবার দুঃখের ঘটনায় দুঃখের কমেন্টস করছে। এখানে ফেসবুক, হোয়াটস এ্যাপ, ম্যাসেঞ্জার এবং অন্যান্য মিডিয়ার সাথে লিঙ্ক আছে। সে ব্যাপারে কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের সচেতন থাকতে হবে। প্রযুক্তি ব্যবহার করেও সমাজের মধ্যে হিংসার আগুন ছড়ানো যায়। তাই এ ব্যাপারে আমাদের সবার সতর্ক থাকতে হবে। তাই কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের সবার সচেতন ও সতর্ক হতে হবে। কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের দক্ষ হতে হবে, আনাড়ি হলে চলবে না। প্রযুক্তি কিভাবে চালাতে হবে সে ব্যাপারে আনাড়ি হলে চলবে না। কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের অবশ্য কন্টেন্ট এর ক্ষেত্রে নীতিবান হতে হবে। তাদের কাছে পর্যাপ্ত ডাটা ও তথ্য সংগ্রহ করতে হবে এবং তা সার্বজনীন হতে হবে এবং প্রচার ও প্রকাশ করতে হবে।
প্রধান অতিথি জনাব আব্দুল লতিফ সেখ, উপ-পরিচালক, জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তর, কুষ্টিয়া, তিনি বলেন, কন্টেন্ট ক্রিয়েটর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু তাদের প্রযুক্তি বিষয়ে তাদের অনেক কিছু জানতে হবে। সমাজের ইতিবাচক বিষয়গুলো সমাজের মধ্যে তুলে ধরতে হবে। এছাড়াও সমাজের ভূক্তভোগীদের অসংগতি যেমন, বয়স্কভাতা, বিধবা যারা পান তাদের টাকা বিকাশের মাধ্যমে দেওয়া হয়। কিন্তু অনেক প্রতারক পিনকোড চুরি করে ভাতাভোগীদের টাকা হাতিয়ে নেন। এরকম নানা ধরনের বিষয় সমাজের মধ্যে তুলে ধরলে সচেতনতা বৃদ্ধি পাবে।
তিনি আরো বলেন, কন্টেন্ট ক্রিয়েটরেরা বর্তমান সমাজে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাদের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা এবং বার্তা তৈরী ও প্রচারণায় তাদের শক্তিকে স্বীকৃতি জানিয়ে তিনি উপস্থিত সকলের প্রতি অনুরোধ রাখেন যেন তাদের কন্টেন্টের মাধ্যমে কারো ক্ষতি না হয়, কোনো বিদ্বেষ না ছড়ায়। তিনি আরও বলেন, অন্যকেউ এমন কন্টেন্ট তৈরী করলে শান্তিপূর্ণভাবে তাকে সঠিক দিকনির্দেশনা দেয়াটাও একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
কুষ্টিয়া জেলার কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের নিয়ে আয়োজিত এই অবহিতকরণ সভার শেষে উপস্থিত প্রত্যেকে সার্টিফিকেট গ্রহণ করেন, এবং ভবিষ্যতে তাদের কন্টেন্টের মাধ্যমে ডিজিটাল উন্নয়ন প্রচারণা এবং টিএফজিবিভি প্রতিরোধে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।