সাতক্ষীরায় প্রযুক্তির প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধে আইনি সহায়তাবিষয়ক পরামর্শ সভা
নিজস্ব প্রতিনিধি : ডিজিটাল রূপান্তরের এই সময়ে প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা বা টিএফজিবিভি (Technology-Facilitated Gender-Based Violence) একটি ক্রমবর্ধমান সামাজিক ও মানবাধিকারগত উদ্বেগ হিসেবে সামনে এসেছে। বিশেষ করে নারী ও কন্যাশিশুরা এ ধরনের সহিংসতার ঝুঁকিতে বেশি থাকায় সচেতনতা বৃদ্ধি, প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ, আইনি সহায়তা এবং কার্যকর সমন্বয় এখন সময়ের দাবি।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ এনজিওস নেটওয়ার্ক ফর রেডিও অ্যান্ড কমিউনিকেশন (বিএনএনআরসি) এবং অগ্রগতি সংস্থা যৌথভাবে ২১ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে সাতক্ষীরায় “প্রযুক্তির সহায়তায় জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধে আইনি সহায়তা বিষয়ক পরামর্শ সভা” আয়োজন করে।
পরামর্শ সভায় ডিজিটাল উন্নয়ন, টিএফজিবিভি’র ধরন ও বিস্তার, এর সামাজিক প্রভাব, প্রতিরোধ ও প্রশমন কৌশল, এবং ভুক্তভোগীদের জন্য আইনি সহায়তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন অংশীজনের ভূমিকা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। একই সঙ্গে জেলা লিগ্যাল এইড অফিস থেকে কীভাবে এ ধরনের ঘটনায় সরকারি আইনি সহায়তা পাওয়া যায়, সে বিষয়েও গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা তুলে ধরা হয়।
এই পরামর্শ সভা আয়োজন করা হয় “Strengthening Resilience against Technology-Facilitated Gender-Based Violence and Promoting Digital Development” স্ট্রেনথেনিং রেজিলিয়েন্স এগেইনস্ট টেকনোলজি-ফেসিলিটেটেড জেন্ডার-বেইসড ভায়োলেন্স (টিএফজিবিভি) এন্ড প্রমোটিং ডিজিটাল ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পের অংশ হিসেবে অনুষ্ঠিত হয়প্রকল্পের আওতায়। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে নাগরিকতা: সিভিক এনগেজমেন্ট ফান্ড (সিইএফ) কর্মসূচির অধীনে। এতে কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে জিএফএ কনসালটিং গ্রুপ এবং অর্থায়ন করছে সুইজারল্যান্ড, গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কানাডা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সাতক্ষীরা জেলার লিগ্যাল এইড অফিসার লিটন দাশ। সভায় বিভিন্ন খাতের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন আইন সহায়তা প্রদানকারী আইনজীবী, প্যানেল আইনজীবী, নারী অধিকারকর্মী, সিআইডি পুলিশের সদস্য, মানবাধিকার জোটের সদস্য, আইনজীবী সমিতির প্রতিনিধি, স্থানীয় সংবাদপত্রের সম্পাদক ও গণমাধ্যমকর্মী, নারী-নেতৃত্বাধীন এনজিও প্রতিনিধি, মানবাধিকারকর্মী এবং যুব প্রতিনিধিরা।
পরামর্শ সভার উদ্দেশ্য ছিল জেলা পর্যায়ে সরকারি ও বেসরকারি আইনি সহায়তা ব্যবস্থার সঙ্গে টিএফজিবিভি বিষয়টিকে আরও কার্যকরভাবে একীভূত করা। একই সঙ্গে টিএফজিবিভি প্রতিরোধে সক্রিয় পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য আইন সহায়তাদানকারী আইনজীবী, নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ জেলা কমিটির সদস্য এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদার করা। এছাড়া নাগরিক সমাজ, সরকারি প্রতিষ্ঠান ও আইনগত সহায়তা প্রদানকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে সংলাপ ও সমন্বয় বাড়ানো, একটি কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং ভুক্তভোগীদের জন্য আইনি সহায়তা সেবা সহজতর করতে জেলা লিগ্যাল এইড অফিস ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর ভূমিকাকে আরও শক্তিশালী করার ওপর জোর দেওয়া হয়।
সভায় অগ্রগতি সংস্থার নির্বাহী পরিচালক আব্দুস সবুর বিশ্বাস বলেন, জেলা লিগ্যাল এইড ব্যবস্থার সঙ্গে সাইবার অপরাধ এবং প্রযুক্তির সহায়তায় জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার বিষয়গুলো যুক্ত করা এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি। তিনি বলেন, শুধু আলোচনা সভা আয়োজন করলেই হবে না, বরং এই আইনি সহায়তা ব্যবস্থাকে বাস্তবে কার্যকর করতে সম্মিলিতভাবে উদ্যোগ নিতে হবে। লিগ্যাল এইড কার্যকর ও সক্রিয় হলে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে নারী ও কন্যাশিশুরা, সাইবার সহিংসতার বিরুদ্ধে আইনি প্রতিকার চাইতে আরও সাহসী হবেন।
বিএনএনআরসির প্রধান নির্বাহী এ এইচ এম বজলুর রহমান টিএফজিবিভি’র সংজ্ঞা, বর্তমান প্রেক্ষাপট এবং এর বিস্তৃত প্রভাব ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, শারীরিক সহিংসতার বিষয়ে সমাজ তুলনামূলকভাবে সচেতন হলেও অনলাইনে হেনস্তা, অপদস্থ করা, ভয়ভীতি প্রদর্শন, ব্যক্তিগত তথ্য বা ছবি ছড়িয়ে দেওয়া, কিংবা ডিজিটাল মাধ্যমে মানসিক নির্যাতনকে অনেক সময় সহিংসতা হিসেবে গণ্য করা হয় না, যা একটি বিপজ্জনক ভুল ধারণা।
তিনি আরও বলেন, প্রযুক্তি এখন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বন্ধ করে দেওয়া কোনো বাস্তবসম্মত সমাধান নয়। বরং চ্যালেঞ্জ হলো, কীভাবে এই প্রযুক্তির নিরাপদ, দায়িত্বশীল এবং মানবিক ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়।
এ এইচ এম বজলুর রহমান আরও উল্লেখ করেন, টিএফজিবিভি কেবল অনলাইন প্ল্যাটফর্মে সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রভাব অফলাইনে থেকেও মানুষের জীবনকে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তিনি বলেন, ভুক্তভোগীকে দোষারোপ করার সামাজিক প্রবণতা পরিহার করে বিদ্যমান সরকারি কাঠামো, কমিটি ও সুরক্ষা ব্যবস্থাগুলোকে আরও সক্রিয় ও জবাবদিহিমূলক করা জরুরি। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানসহ সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনকে সম্পৃক্ত করার ওপরও তিনি জোর দেন।
সাতক্ষীরা জেলা জজ কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট সেলিনা শেলী বলেন, অনেক তরুণ-তরুণী ও কিশোর-কিশোরী প্রযুক্তির ইতিবাচক ব্যবহারের চেয়ে নেতিবাচক প্রভাবের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়ছে, যা উদ্বেগজনক। তিনি বলেন, প্রযুক্তির অপব্যবহার ও এর ক্ষতিকর প্রভাব থেকে নতুন প্রজন্মকে রক্ষা করতে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, এনজিও এবং সচেতন নাগরিকদের একযোগে এগিয়ে আসতে হবে।
বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট)-এর প্রতিনিধি অ্যাডভোকেট দিলীপ কুমার বলেন, প্রযুক্তির নিরাপদ ও দায়িত্বশীল ব্যবহারের শিক্ষা পরিবার থেকেই শুরু হওয়া উচিত। তিনি আরও বলেন, আইনি কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন, যাতে দেশের বাইরে বসে কেউ বাংলাদেশের কোনো নারীকে প্রযুক্তির মাধ্যমে হেনস্তা করলেও তার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়।
মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের সাতক্ষীরা জেলার প্রোগ্রাম অফিসার ফাতেমা জোহরা বলেন, প্রযুক্তি এখন আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই ভয় পেয়ে প্রযুক্তির ব্যবহার বন্ধ করা কোনো সমাধান নয়। বরং নিরাপদ ব্যবহারের কৌশল শেখা এবং তা অন্যদের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়াই সচেতনতার পরিচয়।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে সাতক্ষীরা জেলার লিগ্যাল এইড অফিসার লিটন দাশ বলেন, টিএফজিবিভি বিষয়ে একটি স্পষ্ট এবং বহুলপ্রচারিত প্রাতিষ্ঠানিক ধারণা তৈরি করা জরুরি। মানুষ যদি না বুঝতে পারে যে সে কী ধরনের সহিংসতার শিকার হচ্ছে, তবে সচেতনতা বাড়িয়েও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। তিনি আশ্বস্ত করেন যে, সাতক্ষীরা জেলা লিগ্যাল এইড অফিস টিএফজিবিভি-সংক্রান্ত বিষয়গুলোতে বিশেষ গুরুত্ব দেবে এবং এ ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিকভাবে আইনি সহায়তা ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
সভায় বক্তারা বাংলাদেশ পুলিশের Police Cyber Support for Women সেবার কথাও উল্লেখ করেন। নারী ও কন্যাশিশুরা সাইবার সহিংসতার ঘটনায় সহায়তা পেতে 01320-000888 নম্বরে যোগাযোগ করতে পারেন অথবা [email protected]
ঠিকানায় ই-মেইল করতে পারেন।
বক্তারা বলেন, প্রযুক্তিনির্ভর সহিংসতা প্রতিরোধে শুধু আইন থাকাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন কার্যকর বাস্তবায়ন, আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়, দ্রুত প্রতিকার, সামাজিক সংবেদনশীলতা এবং ভুক্তভোগী-সহায়ক ব্যবস্থা। সাতক্ষীরার এই পরামর্শ সভা সেই প্রয়োজনীয় সংলাপ, সহযোগিতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংযোগকে আরও জোরদার করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।