পটুয়াখালীতে বিএনএনআরসির উদ্যোগে সিএসওদের দক্ষতা উন্নয়ন কর্মশালা
নিজস্ব প্রতিনিধি : বাংলাদেশ এনজিওস নেটওয়ার্ক ফর রেডিও এন্ড কমিউনিকেশন (বিএনএনআরসি)-এর উদ্যোগে ‘ডিজিটাল উন্নয়ন ও প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডার-ভিত্তিক সহিংসতা(টিএফজিবিভি) প্রতিরোধ, প্রশমন ও করণীয়: নাগরিক সমাজ সংগঠনের প্রতিনিধিদের দক্ষতা উন্নয়ন’ শীর্ষক দিনব্যাপী এক কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে। পটুয়াখালী প্রেসক্লাবে আয়োজিত হলে আয়োজিত এই কর্মশালায় পটুয়াখালীর নাগরিক সমাজ সংগঠন (সিএসও), এনজিও, নারী সংগঠন ও নারী প্রধান সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন।
কর্মশালার শুরুতে স্বাগত বক্তব্যে মাহাফুজা ইসলাম উল্লেখ করেন কর্মশালার মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডার-ভিত্তিক সহিংসতার ধরন, প্রভাব এবং এর প্রতিরোধে নাগরিক সমাজ সংগঠনের প্রতিনিধিদের সচেতন ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনে উদ্বুদ্ধ করা। সিনিয়র সাংবাদিক ফিরোজ আহমেদ কর্মশালায় প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডার-ভিত্তিক সহিংসতার ধরন ও প্রভাব নিয়ে পটুয়াখালীর প্রেক্ষাপট উপস্থাপন করেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জনাব শারমিন আক্তার, জেলা প্রশাসকের প্রতিনিধি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও সহকারী কমিশনার, পটুয়াখালী জেলা। উল্লেখ্য, বিএনএনআরসি ‘স্ট্রেনদেনিং রেজিলিয়েন্স এগেইনস্ট টেকনোলজি ফেসিলিটেটেড জেন্ডার বেইজড ভায়োলেন্স (টিএফজিবিভি) এন্ড প্রমোটিং ডিজিটাল ডেভেলপমেন্ট’ প্রকল্পের আওতায় এই কর্মশালা আয়োজন করেছে। প্রকল্পটি ‘নাগরিকতা: সিভিক এনগেজমেন্ট ফান্ড (সিইএফ)’ কর্মসূচির অংশ, যা সুইজারল্যান্ড, গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নে এবং জিএফএ কনসালটিং গ্রুপের কারিগরি সহায়তায় বাস্তবায়িত হচ্ছে।
কর্মশালায় ৪জন প্যানেল স্পিকার ও ৮জন ডেজিগনেটেড স্পিকার বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করেন।
নাগরিক সমাজ সংগঠনের প্রতিনিধিদের ডিজিটাল উন্নয়ন এবং টিএফজিবিভি মোকাবিলা ও প্রতিরোধে সচেতন ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনে উদ্বুদ্ধ করা এবং এই বিষয়গুলোকে তাদের নিজস্ব সংস্থার কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করতে সহায়তা করাই ছিলো প্রধান উদ্দেশ্য।
আলোচকবৃন্দ বলেন, বাংলাদেশে ডিজিটাল রূপান্তরের এই সময়ে প্রযুক্তির অপব্যবহারও বাড়ছে। ইউএনএফপিএ-এর ২০২৪ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৮৯ শতাংশ নারী ও কন্যা শিশু প্রযুক্তির মাধ্যমে সহিংসতার শিকার হয় এবং এদের মধ্যে ৭৫ শতাংশ ভুক্তভোগী কোনো ধরনের আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করেন না। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় নাগরিক সমাজ সংগঠনের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম অত্যন্ত জরুরি।
কর্মশালায় ফেসবুক ও ইমেইলে শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ও টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন, আপত্তিকর কন্টেন্ট রিপোর্ট করার প্রক্রিয়া, এবং প্রযুক্তিনির্ভর সহিংসতা প্রতিরোধে বিদ্যমান আইন ও আইনি সহায়তা প্রাপ্তির প্রক্রিয়া নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। আলোচকবৃন্দ ডিজিটাল ডেভেলপমেন্ট এবং টিএফজিবিভি বিষয়ে জনসচেতনতায় জোর দেন এবং সরকারের কার্যকর উদ্যোগ পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন হেল্পলাইন (০১৩২০০০০৮৮৮) ও ইমেইল ([email protected])সহ সরকারের অন্যান্য কার্যকর উদ্যোগ ও সেবা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেন।
প্রধান অতিথি তাঁর বক্তব্যে বলেন, বর্তমানে নারীরা ঘরে ও বাইরে যেমন বিভিন্নভাবে নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন, তেমনি ডিজিটাল মাধ্যমেও প্রতিনিয়ত প্রতারণার জালে জড়িয়ে পড়ছেন। প্রযুক্তিনির্ভর এই সহিংসতার শিকারদের মধ্যে একটি বড় অংশই হলো অল্পবয়সী স্কুল-কলেজ পড়ুয়া মেয়েরা। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায় লোকলজ্জা বা ভয়ের কারণে তাদের ওপর ঘটে যাওয়া নির্যাতন বা হয়রানির কথা পরিবারকে কিছুই জানায় না।
অন্যদিকে, অনেক পরিবারও সচেতন নয় যে এ ধরনের ঘটনায় কোথায় গেলে প্রতিকার পাওয়া যাবে বা কীভাবে আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে। এই সঠিক নির্দেশনার অভাবেই মূলত ভুক্তভোগীরা কাঙ্ক্ষিত বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। অথচ বর্তমান সরকার সাইবার অপরাধ দমনে অত্যন্ত তৎপর। সরকারের জেলা লিগ্যাল এইড অফিস, পুলিশের বিশেষায়িত সাইবার ইউনিট এবং সিআইডির সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ইউনিট দিনরাত কাজ করে যাচ্ছে। এখানে ভুক্তভোগীরা খুব সহজেই অভিযোগ জানিয়ে আইনি সুরক্ষা ও বিচার পেতে পারেন। কিন্তু দুঃখজনক হলো, সাধারণ মানুষের একটি বিশাল অংশ এই সেবাগুলো সম্পর্কে এখনো অবগত নন।
“প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে নারীর প্রতি সহিংসতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে যা প্রতিরোধ করতে হলে সবাইকে নিজ নিজ জায়গা থেকে কাজ করতে হবে। যেহেতু কন্যা শিশুরা ও মেয়েরা প্রথম টিএফজিবিভির শিকার হয়, তাই ডিজিটাল দুনিয়ায় করণীয় ও বর্জনীয় সম্পর্কে ধারণা অভিভাবকদের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া গেলে নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে তা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করবে”।
কর্মশালার ‘ডিপ ডাইভ’ সেশনে বক্তারা জেলা পর্যায়ে টিএফজিবিভি সংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যা ও তা উত্তরণের সম্ভাব্য উপায় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।
কর্মশালায় অংশগ্রহণকারীবৃন্দ তাদের নিজ নিজ কর্মএলাকায় টিএফজিবিভি প্রতিরোধ ও প্রশমনে ভুক্তভোগীদের সহায়তা প্রাপ্তিতে সক্রিয়ভাবে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। এই উদ্যোগের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধ এবং নারীদের জন্য একটি নিরাপদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ডিজিটাল পরিবেশ গড়ে উঠবে বলে আয়োজকরা আশাবাদ ব্যক্ত করেন।