মায়াজালে এখনো আমি । আনান্নিয়া আন্নি

পর্বঃ ০৪
ডায়েরির পরের পাতা উল্টাতে যাবে ঠিক সেই সময়ে রান্নাঘর থেকে ছোট কাকির ডাক এলো; কুমু….
একটু ভাতের চাল টা ধুয়ে দিয়ে যা না মা, আমি মাছগুলো ভেজে নেই ততক্ষণে।

ভাতের চাল ধুয়ে চুলোয় বসিয়ে আবারও ঘরে চলে এলো কুমু। মনের ভেতরে তার বিশাল এক কৌতুহল বাসা বেঁধেছে, কি হয়েছিল কেনো হয়েছিল সবটা জানতে হবে।

ডায়েরির পরের পাতার তারিখের এবার বেশ অনেকটা সময়ের ব্যাবধান…

প্রায় তিন মাস পর লেখা হয়েছিল;

(১৪ এপ্রিল ২০১৭)
বাংলা নববর্ষ আজ। ভেতর-টায় একটা দগদগে ক্ষত নিয়ে সবার সামনে নিজেকে গুছিয়ে উপস্থাপন করে যাচ্ছি। বছরের শুরু তে আজও ইমাদ এর সাথে আমার ঝগড়া হয়েছে কোনো এক কারনে। তারপর ও বাড়ির সবার সাথে আজ আবারও লাল পার সাদা শাড়ি পরে, মাথায় সাদা ফুলের গাজরা দিয়ে একটু সাজলাম, মন ভালো করার এটা এক বৃথা চেষ্টা ও বলা চলে। নিজেকে সুন্দর করে ক্যামেরা বন্দি করে একখানা ছবি তাকে হোয়াটসঅ্যাপ করলাম।
মিনিট দশেক বাদে তার রিপ্লাই এলো;

নববর্ষ বলে কি এভাবে সাজতে হবে? আর সেজেছো যখন তখন ফটো উঠতে বলেছে কে? নাকি অন্য কারো মন জয় করতে এতো রং ঢং? জানোনা এসব আমি একদম পছন্দ করিনা?

কথাগুলো বুকের মধ্যে কেমন একটা কম্পনের সৃষ্টি করলো; আমার ভেতরের দগদগে আগুন টুকু যার চোখে পরেনি, তবে আমার সামান্য সাজ সজ্জায় জোরপূর্বক নিজেকে ক্যামেরাবন্দি করা এই ছবি কিনা অন্য কারো মন জয় করার উদ্দেশ্য তোলা এইরকম নোংরা ধ্যান ধারনা তার ভেতরে কি করে আসতে পারে?

মেসেজ খানা পরার পর সাথে সাথে শাড়ি গয়না সব খুলে ফেলেছিলাম, কেমন একটা লজ্জা আর ঘৃনায় ভেতরের কষ্ট গুলো চোখের জল হয়ে বেরোচ্ছিলো।

(১৯ এপ্রিল)
টানা পাঁচ দিন কথা বলিনি ইমাদের সাথে,সেও আর কথা বলতে আসেনি এমনকি শাড়ি পরে নিজের ছবি খানা তাকে দেয়ার পর তার এরকম একটা প্রত্তুত্যরে মেয়েটার মনের অবস্থা কেমন হয়েছিল সেটাও জানতে আসেনি সে একবারের জন্যও…

(২২ এপ্রিল)
আজ ইমাদ-এর নতুন চাকরি তে প্রথম দিন। সে বলেছিলো আর খুব বেশি সময় নেই, চাকরি হয়ে গেলে খুব তাড়াতাড়ি তোমায় বিয়ে করে আনবো, তারপর তুমি শুধু আমার বউ হয়ে বাড়িতে থাকবে, এতোসব বাইরে গিয়ে চাকরি করার কোনো দরকার নেই তোমার। অথচ বাবা মা মরা মেয়ে টাকে তার বড় ভাই ভাবি পড়াশোনা করাচ্ছে তাকে একটা চাকরি করে নিজের পায়ে দাঁড় করানোর জন্য যেনো ভবিষ্যতে তাকে পরের মুখাপেক্ষী হতে না হয় সেটা আমি তাকে বোঝাতেই পারিনি। তবে কি হবেনা আমার নিজের পায়ে দাঁড়ানো? ভালোবাসা নামক বস্তু টার কাছে কি হেরে যাবে ভাই এর কাছে কথা দেয়া কোনো বোনের স্বনির্ভর হওয়ার স্বপ্ন?যদিও এটাকে আমার এখন ভালোবাসা বলে মানতে কষ্ট হচ্ছে একথা বলাই বাহুল্য!

ঝিলি… তুই কি কিছু বুঝতে পারছিস? আমার তো মনে হচ্ছে আমি কোনো বড় লেখকের লেখা কোনো বই পড়ছি..

পরের পাতা টা উল্টা না তাড়াতাড়ি শেষ কর, বড় মামি রা চলে এলে আর পড়া হবেনা।

(০৪ অক্টোবর)
বেশ কয়েকমাস কেটে গেলো;
সবকিছু যার যার নিজস্ব নিয়মে চলছে। ইমাদ চাকরি নিয়ে ব্যাস্ত, আমি আমার পড়াশোনা নিয়ে।
আজ বাড়ির সবার সাথে একটু বেড়িয়েছিলাম, বাড়ির সবাই আমার সম্পর্ক টার ব্যাপারে জানে,বড় ভাইয়া একদম পছন্দ করেনা ইমাদ কে, তবে ভাবি আজকাল আমাকে নিখুঁতভাবে খেয়াল করতে শুরু করেছে, আমার মন খারাপের কারন গুলো ভাবি বুঝতে পারে বোধহয়। তাই আজ একরকম জোর করে আমাকে নিজের একটা শাড়ি পরিয়ে বেশ সুন্দর করে সাজিয়ে দিয়ে বললো;
সবসময় অমন মনমরা হয়ে থেকোনা তো, অপ্সরা রা কি এরকম মনমরা হয়ে থাকে? এমন সুন্দর মুখখানা সবসময় হাসিখুশি থাকলে কত সুন্দর লাগে দেখেছো?

ঝিলের পাড়ে দু’পা মেলে বসে আছি;
ভাইয়া আর ভাবি কুমু কে নিয়ে ঝিলের ওপাশ টায় গিয়েছে,পুরো ঝিল টা লাল শাপলায় ভরে গিয়েছে, কুমু ও বায়না ধরেছে বলে ওদিকটায় গিয়েছে সবাই।

দেখ ঝিলি,, ছোট ফুপু আমার কথা ও লিখেছে। আমার তো মনে আছে আমরা সবাই মিলে গিয়েছিলাম তো ঝিলের ধারে বেড়াতে অনেক বছর আগে। অনেক দিন আগের কথা যদিও তারপর ও মনে আছে আমার।

আরে বাবা তোর কথা কে শুনতে চাইছে বলতো? জলদি পড় না কি হয়েছিল সেদিন ঝিলের পাড়ে?? বড্ড কথা বলিস তুই।

আচ্ছা বাবা পড়ছি শোন…

আনমনে বসে অন্যমনস্ক হয়ে কিছু একটা ভাবছিলাম; আমি কেবল ফুল ভর্তি ঝিলের দিকে চেয়ে তার অপরুপ সৌন্দর্যে বিমোহিত হয়ে কি একটা যেনো ভাবছিলাম।

সামনে একটা জীবন্ত পরী,
অতঃপর লাইট ক্যামেরা আ্যকশন…
বাহ্ বেশ মিষ্টি লাগছে কিন্তু আপনাকে, অসম্ভব সুন্দর দেখতে লাগছে কিন্তু মুখটা অমন গোমড়া করে বসে আছেন কেনো বলুনতো?

কোত্থেকে যেনো ছেলেটা দুম করেই চলে এলো, কথা নেই বার্তা নেই কয়েকটা ছবি তুলে আমার সামনে আমার পারমিশন ছাড়া আমারই সৌন্দর্যের প্রশংসা করতে শুরু করলো, বেশ অবাক হলাম বটে!
আমি কিছু বলবো সেরকম সুযোগ পাচ্ছি কই, তার কথাই তো থামছেনা, কি অদ্ভুত!

বেড়াতে এসেছেন এখানে? একাই এসেছেন নাকি প্রিয়জনকে নিয়ে ঝিল দেখতে এসেছেন? প্রিয়জনকে সঙ্গে করে আনলে তো এমন মনমরা হয়ে বসে থাকবার কথা নয়, বোধহয় আপনি ছ্যাকা খেয়েছেন না?

কথাগুলো বলেই ছেলেটা কেমন হা হা করে হেসে উঠলো,বড্ড আশ্চর্য ব্যাপার তো!

কে আপনি? এভাবে আমার অনুমতি ছাড়া ছবি তুললেন কেনো?

ওহ সরি ম্যাডাম আমি আসলে আপনার ছবি তুলিনি, ফুল ভর্তি ঝিলের সামনে একটা পরী বসেছিলো আমি তারই ছবি তুলেছি।
নাম কি আপনার পরী নাকি অপ্সরা?

আশ্চর্য ছেলেটা কি আন্দাজ করতে পেরেছে আমার নাম অপ্সরা নাকি কাকতালীয় ভাবে মিলে গেলো ব্যাপারটা?
আমি কিছু একটা উত্তর দিতে যাবো ঠিক তখনই ওপাশ থেকে ভাইয়া ডেকে উঠলো

অপ্সরা… এপাশ টায় চলে আয়। কুমু তোকে ডাকছে।

আমি আর কথা না বাড়িয়ে ওখান থেকে উঠে চলে এলাম।
কিন্তু পেছন থেকে ছেলেটার কথাগুলো শুনতে পাচ্ছিলাম;

দেখেছেন তো সত্যি আপনার নাম টা মিলে গেলো?তারমানে আপনাকে অপুর্ব সুন্দর লাগছে এটাও সত্যি বলেছি কিন্তু… সবসময় এরকম সেজেগুজে থাকবেন, বড্ড বেশি সুন্দর দেখায় আপনাকে। আর পারলে একটু হাসিখুশি থাকার চেষ্টা করবেন।না জানি ঐ হাসিমুখ টা কত সুন্দর দেখায় আপনার!

ঝিলি বুঝতে পারছিস কি কিছু? এই মনেহয় ছোট ফুপু-র সেই প্রেমিক থুরি সেই ভালোবাসার মানুষ টা বল?

ভালোবাসার মানুষ কেনো বললি, প্রেমিক নয় কেনো?

আরে বুঝলিনা প্রেমিক এর সাথে তো ছোট ফুপু-র বিয়েই হয়েছে, আর প্রেমিক পুরুষ এর জন্য কোনো মেয়ে এতো পাগল হয়না রে, ভালোবাসা-র মানুষ টার জন্য মানুষ এরকম পাগল হয়ে যায় যেমন টা ছোট ফুপু হয়েছে।

হু.. বড্ড বেশি জেনেছো তুমি? তা তোমার এতো অভিজ্ঞতা হয়েছে কোত্থেকে শুনি? এসেছে কি এমন কেউ তোমার জীবনেও?

আরে চুপ করতো, এখন এই কাহিনি টা আগে শেষ করতে দে….

এবারে এক অন্যরকম ঘটনা ঘটতে চলেছে ডায়েরির পরের পাতায়;

অপ্সরার জীবনে এবার ঘটতে চলেছে এমন কিছু যা অপ্সরা নিজেও কখনও ভাবতে পারেনি..

চলবে

 

মায়াজাল
Comments (0)
Add Comment