টিএফজিবিভি প্রতিরোধে বহুঅংশীজনদের জোরালো ভূমিকা পালন করতে হবে – হীরেন পণ্ডিত
বাংলাদেশ ডিজিটাল রূপান্তরের যাত্রায় এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে অবস্থান করছে। বৈশ্বিক তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির (আইসিটি) দ্রুত অগ্রগতি এবং ডিজিটাল জনসেবার ক্রমবর্ধমান চাহিদা এ প্রক্রিয়াকে আরও জরুরি ও প্রাসঙ্গিক করে তুলেছে। বাংলাদেশের উন্নয়ন অভিযাত্রায় ডিজিটাল রূপান্তর এখন আর একটি বিকল্প নয়, বরং টেকসই অগ্রগতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। কৌশলগত তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে শাসনব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা, সেবাপ্রদানকে আরও দক্ষ ও স্বচ্ছ করা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করা সম্ভব হচ্ছে। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই বিভিন্ন ডিজিটাল উদ্যোগ হাতে নিয়েছে, যা জনসেবা সহজীকরণ থেকে শুরু করে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতিশীলতায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।
শাসনব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে আইসিটি একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। ই-গভর্নেন্স কার্যক্রম চালু হওয়ার ফলে সরকারি সেবায় জবাবদিহিতা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং নাগরিকরা দ্রুত ও স্বচ্ছ সেবা পাচ্ছেন। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে নীতি প্রণয়ন, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সেবা প্রদান প্রক্রিয়ায় নাগরিকদের সম্পৃক্ততা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সেবাপ্রদান উন্নয়নের ক্ষেত্রে প্রযুক্তি নির্ভর সমাধান একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। অনলাইন সেবা, মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন ও ডিজিটাল হেল্পডেস্কের মাধ্যমে নাগরিকরা ঘরে বসেই প্রয়োজনীয় সরকারি ও বেসরকারি সেবা পাচ্ছেন। এর ফলে সময় ও খরচ কমছে এবং মানুষের জীবনমান উন্নত হচ্ছে। তথ্য প্রযুক্তির বিকাশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এর অপব্যবহারও বেড়ে চলেছে, বেড়েছে প্রযুক্তির সহায়তায় সহিংসতাও। সমাজের নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ প্রতিনিয়ত অনলাইনে সহিংসতার শিকার হচ্ছেন, যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যকই নারী।
ডিসেম্বর, ২০২৪-এ, ইউএনএফপিএ প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী- সারা বিশ্বে প্রতি ৩ জনে ২ জন নারী প্রযুক্তি ব্যবহার করে সহিংসতার শিকার হয়। বাংলাদেশে শতকরা ৮৯ শতাংশ নারী ও মেয়ে শিশু প্রযুক্তি ব্যবহার করে সহিংসতার শিকার হয়। ৯-১৪ বছর বয়সে প্রথম সাইবার অপরাধের শিকার হয় এবং ১৮-৩০ বছর বয়সী নারীরা সবচেয়ে বেশি প্রযুক্তি ব্যবহার করে সহিংসতার শিকার হয়। এদের মধ্যে ছাত্রী ও অবিবাহিত নারীরা বেশি হয়রানির শিকার হন। শতকরা ৭৫ শতাংশ নারী ভুক্তভোগী তাদের পরিবারকে এ ব্যাপারে জানান না এবং শতকরা ৭৫ শতাংশ নারী ভুক্তভোগী কোন ধরণের আইনি ব্যবস্থা নেন না।
পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন (পিসিএসডব্লিউ)-এর তথ্য বলছে, গত ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৪ পর্যন্ত তাদের কাছে সাইবার অপরাধের শিকার ৬০ হাজার ৮০৮ জন নারী প্রতিকার চেয়েছেন। সাইবার স্পেসে ভুক্তভোগী এসব নারীর ৪১ ভাগই ডক্সিংয়ের শিকার হয়েছেন। এছাড়া ১৮ ভাগ ফেসবুক আইডি হ্যাক, ১৭ ভাগ ব্ল্যাকমেইলিং, ৯ ভাগ ইমপার্সোনেশন, ৮ ভাগ সাইবার বুলিংজনিত সমস্যা নিয়ে অভিযোগ করেছেন।
এভাবে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে নারীর অংশগ্রহণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে অর্থনীতিসহ দেশের উন্নয়নের সব ক্ষেত্রে। কেননা দেশের অর্ধেক জনসংখ্যাকে অনলাইনে অনিরাপদ রেখে অগ্রগতির কোনো লক্ষ্য পূরণ করাই সম্ভব নয়।
প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা সম্পর্কে ব্যাপক উদ্যোগ বাড়ানো প্রয়োজন। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট অংশীজন তথা সরকারি-বেসরকারী প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, নাগরিক সমাজ সংগঠন, আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, জনপ্রতিনিধি, গণমাধ্যম এবং নীতি-নির্ধারকদের ভূমিকা জোরালো করার মাধ্যমে আমাদের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোতে সকলের বিশেষ করে নারীর জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা এখন সময়ের দাবী।
একটি নিরাপদ ডিজিটাল পরিসর ও টেকসই ডিজিটাল উন্নয়ন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে কমিউনিটি-চালিত সমাধান, নেটওয়ার্কিং এবং অংশীদারিত্বকে উৎসাহিত করা। টিএফজিবিভি প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের তথা- স্থানীয় প্রশাসন, প্রযুক্তি কোম্পানী, নাগরিক সমাজ সংগঠনের প্রতিনিধি, এনজিও প্রতিনিধি ও নারী প্রধান সংগঠনের প্রতিনিধি, যুব ও যুব নারী এবং গণমাধ্যম কর্মীদের ধারণা প্রদান এবং করণীয় সম্পর্কে আলোকপাত করা। ডিজিটাল উন্নয়ন তথা ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে অর্থনীতি, সরকার এবং সমাজের মধ্যে আন্তঃসম্পর্ক জোরদারকরণ। প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডার-ভিত্তিক সহিংসতা টিএফজিবিভি মোকাবিলা এবং টিএফজিবিভি এর ভুক্তভোগীদের সেবা প্রাপ্তিতে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে সংশ্লিষ্টদের সাথে অংশীজনদের কৌশলগত যোগাযোগ স্থাপনের সুযোগ সৃষ্টি করা এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের করণীয় নির্ধারণে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণে তাদের সচেষ্ট করা। সংলাপের অংশগ্রহণকারী অংশীজন এবং তাদের সংস্থার সহযোগী সংস্থা, অংশীজন ও উপকারভোগীদের মধ্যেও বিষয়টি সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি হবে। সংলাপের অংশগ্রহণকারী অংশীজন ও সরকারি প্রতিনিধিদের মধ্যে সমন্বয় জোরদার হবে।
সংলাপের অংশগ্রহণকারী অংশীজন সংগঠনসমূহের মধ্যেও সহযোগিতা, অংশীদারিত্ব এবং নেটওয়ার্কিং সম্প্রসারিত করা। এছাড়া তাদের কর্ম পরিকল্পনা নির্ধারণ এবং তা বাস্তবায়নের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে টিএফজিবিভি-এর শিকার বা ভুক্তভোগীরা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সরকারী-বেসরকারী আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থাসমূহ থেকে সেবা গ্রহণে উৎসাহী হবেন। বাংলাদেশ এখন ডিজিটাল রূপান্তরের এক গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে। জনসেবার ডিজিটালায়ন, তথ্যপ্রযুক্তির বিস্তার এবং অর্থনীতির পরিবর্তিত বাস্তবতায় প্রযুক্তি আজ উন্নয়নের অপরিহার্য ভিত্তি। ই-গভর্ন্যান্স, অনলাইন সেবা, মোবাইল অ্যাপ ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম নাগরিকসেবা সহজ করেছে, সময় ও ব্যয় কমিয়েছে, বাড়িয়েছে অংশগ্রহণও। কিন্তু এই অগ্রগতির পাশাপাশি বেড়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার। অনলাইন পরিসর এখন শুধু যোগাযোগ, শিক্ষা বা ব্যবসার ক্ষেত্র নয়, এটি হয়রানি, ব্ল্যাকমেইল, পরিচয় জালিয়াতি, ছবি বিকৃতি, ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস ও নানা ধরনের সহিংসতারও ক্ষেত্র হয়ে উঠছে। এ সহিংসতার শিকার হচ্ছেন অনেকে, তবে নারী ও মেয়েরাই তুলনামূলকভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এই বাস্তবতার প্রভাব পড়ছে নারীর মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, অনলাইন অংশগ্রহণ, মানসিক সুস্থতা, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও নেতৃত্বের ওপর। দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী যদি ডিজিটাল পরিসরে নিরাপদ না থাকে, তবে ডিজিটাল উন্নয়নও পূর্ণতা পায় না। নিরাপদ, ন্যায়ভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে হলে প্রযুক্তিনির্ভর জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধ ও প্রশমনকে এখনই অগ্রাধিকার দিতে হবে।
প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা (টিএফজিবিভি) বলতে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বা অন্যান্য প্রযুক্তিগত মাধ্যম ব্যবহার করে জেন্ডারের ভিত্তিতে কোনো ব্যক্তি, বিশেষত নারী ও মেয়েদের বিরুদ্ধে সংঘটিত সহিংসতা, হয়রানি, নজরদারি, হুমকি, অপমান, শোষণ বা ক্ষতিকর আচরণকে বোঝায়। এ ধরনের সহিংসতা আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে প্রযুক্তিনির্ভর হতে পারে এবং তা এক বা একাধিক ব্যক্তি দ্বারা সংঘটিত হতে পারে। টিএফজিবিভির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, এটি কেবল অনলাইন পরিসরে সীমাবদ্ধ নয়। তেমনি এটি পুরনো বা নতুন – যেকোন ধরনের প্রযুক্তির মাধ্যমেও ঘটতে পারে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মেসেজিং অ্যাপ, মোবাইল ফোন, জিপিএস ট্র্যাকিং ডিভাইস, রেকর্ডিং যন্ত্র বা অন্যান্য প্রযুক্তিগত মাধ্যম ব্যবহার করেও এ ধরনের সহিংসতা সংঘটিত হতে পারে। ফলে এটি শুধু একটি প্রযুক্তিগত সমস্যা নয়; বরং জেন্ডার বৈষম্য, ক্ষমতার অসমতা এবং নিরাপত্তাহীনতার একটি বহুমাত্রিক প্রকাশ।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ এনজিওস নেটওয়ার্ক ফর রেডিও এন্ড কমিউনিকেশন (বিএনএনআরসি) বাস্তবায়ন করছে ‘স্ট্রেনদেনিং রেজিলিয়েন্স এগেইনস্ট টেকনোলজি ফ্যাসিলিটেটেড জেন্ডার বেইসড ভায়োলেন্স (টিএফজিবিভি) অ্যান্ড প্রমোটিং ডিজিটাল ডেভেলপমেন্ট’ প্রকল্পটি। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে নাগরিকতা: সিভিক এনগেজমেন্ট ফান্ড (সিইএফ) কর্মসূচির অধীনে এতে অর্থায়ন করেছে সুইজারল্যান্ড দূতাবাস, গ্লোবাল এ্যাফেয়ার্স কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। কারিগরি সহায়তা দিয়েছে জিএফএ কনসালটিং গ্রুপ। এই উদ্যোগের আওতায় দেশের ছয়টি জেলা ও নয়টি কমিউনিটি রেডিওকে যুক্ত করে সচেতনতা বৃদ্ধি, ভুক্তভোগীদের সহায়তা, সক্ষমতা উন্নয়ন এবং বহুপক্ষীয় অংশীদারত্ব গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রযুক্তির সহায়তায় জেন্ডার-ভিত্তিক সহিংসতা সম্পর্কে ব্যাপক সচেতনতা বাড়ানো এবং সশ্লিষ্ট অংশীজন তথা সরকারি-বেসরকারী প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, নাগরিক সংগঠন, আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, জনপ্রতিনিধি, নীতি-নির্ধারক এবং গণমাধ্যমসহ সোশ্যাল মিডিয়ার ভূমিকা জোরালো করার মাধ্যমে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোতে সকলের বিশেষ নারীর জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা ভীষণভাবে জরুরি।
প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডার ভিত্তিক সহিংসতা সম্পর্কিত বিষয়গুলো চিহ্নিত করে সংবাদ প্রকাশ এবং নিয়মিত অ্যাডভোকেসির মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে টিএফজিবিভি প্রতিরোধে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ অন্যান্য অংশীজনদের ভূমিকা ও করণীয় নিশ্চিতকরণে ভূমিকা রাখা। প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডার ভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধে স্থানীয় প্রশাসন, প্রযুক্তি কোম্পানী, নাগরিক সমাজ সংগঠনের প্রতিনিধি, এনজিও ও নারী প্রধান সংগঠনের প্রতিনিধি, যুব সমাজ এবং গণমাধ্যম কর্মীদের সুনির্দিষ্ট ধারণা প্রদান এবং তাদের করণীয় সম্পর্কে আলোকপাত করা।
ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে অর্থনীতি, সরকার এবং সমাজের মধ্যে আন্তঃসম্পর্ক জোরদারকরণের মাধ্যমে সামগ্রিক ডিজিটাল উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা। প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডার-ভিত্তিক সহিংসতা মোকাবিলা এবং ভুক্তভোগীদের সেবা প্রাপ্তিতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সাথে কৌশলগত যোগাযোগ স্থাপনের সুযোগ সৃষ্টি করা। সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের করণীয় নির্ধারণের মাধ্যমে টিএফজিবিভি প্রতিরোধে তাদের কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণে সচেষ্ট করা।
বিএনএনআরসির উদ্যোগে বরিশাল, পটুয়াখালী, পিরোজপুর, কুষ্টিয়া, সাতক্ষীরা ও ময়মনসিংহ জেলার সদর পর্যায়ে মোট ছয়টি সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। এসব সংলাপের উদ্দেশ্য ছিল স্থানীয় অংশীজনদের প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডার-ভিত্তিক সহিংসতা (টিএফজিবিভি) বিষয়ে সম্পৃক্ত করা, স্থানীয় বাস্তবতা পর্যবেক্ষণে উৎসাহিত করা এবং এ বিষয়ে তাদের সক্ষমতা জোরদার করা। সংলাপগুলোর অংশগ্রহণকারী নির্বাচন ও অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। ‘কেউ পিছিয়ে থাকবে না’ নীতি অনুসরণ করে শুধুমাত্র মোট অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা নয়, বরং নারী-পুরুষের ভারসাম্য এবং সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়। এর ফলে সংলাপগুলোতে বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতা, মতামত ও বাস্তবতা প্রতিফলিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
সংলাপে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হয়েছে। মোট ২৪৮ জন অংশগ্রহণকারীর মধ্যে ৮৩ জন ছিলেন ধর্মীয় সংখ্যালঘু, জাতিগত সংখ্যালঘু, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, দলিত সম্প্রদায় এবং হিজড়া জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি, যা মোট অংশগ্রহণকারীর ৩৯ দশমিক ৯০ শতাংশ। অন্যদিকে, ২ জন অংশগ্রহণকারী এ-সংক্রান্ত তথ্য জানাতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেন।
ভুক্তভোগীরা অনেক ক্ষেত্রে স্ক্রিনশট, লিংক, চ্যাট হিস্টোরি বা অন্যান্য ডিজিটাল প্রমাণ যথাযথভাবে সংরক্ষণ করতে পারেন না। মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা, জটিল প্রক্রিয়া এবং পুনরায় হয়রানির আশঙ্কাও অভিযোগ দায়েরে নিরুৎসাহিত করে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি জোরদার হয়, ভুক্তভোগীদের আস্থা কমে যায় এবং অপরাধীরা শাস্তিহীনতার সুযোগ পায়। ভুয়া আইডি শনাক্তকরণ, আপত্তিকর কনটেন্ট অপসারণ এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মভিত্তিক অপরাধে দ্রুত প্রতিক্রিয়া দিতে প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা প্রতিকার বিলম্বিত হয়, ক্ষতির মাত্রা বৃদ্ধি পায় এবং ভুক্তভোগীরা সময়মতো সুরক্ষা পান না। অনিবন্ধিত সিম কার্ড ব্যবহার করে ভুয়া পরিচয়, আর্থিক প্রতারণা এবং মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসভিত্তিক জালিয়াতির ঘটনা ঘটছে বলে অংশীজনরা উল্লেখ করেছেন। অপরাধীদের শনাক্ত করা কঠিন হয় এবং সাধারণ মানুষের আর্থিক ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়ে।
প্রযুক্তির নিরাপদ ব্যবহার, গোপনীয়তা সুরক্ষা, সাইবার আইন এবং প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডার ভিত্তিক সহিংসতা সম্পর্কিত ধারণাগত বোঝাপড়ায় বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। মানুষ সহজেই প্রতারণা, হয়রানি, ব্ল্যাকমেইল ও তথ্য অপব্যবহারের শিকার হয়, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে যথাযথ প্রতিকার খুঁজে পায় না। পারিবারিক তদারকির অভাব, স্মার্টফোননির্ভরতা এবং প্যারেন্টাল কন্ট্রোল সম্পর্কে অভিভাবকদের সীমিত সচেতনতা শিশুদের অনুপযুক্ত অনলাইন কনটেন্টের ঝুঁকিতে ফেলছে। শিশুদের মানসিক, সামাজিক ও আচরণগত বিকাশ ব্যাহত হতে পারে এবং অনলাইন শোষণ বা আসক্তির ঝুঁকি বাড়ে।
অনলাইন পরিসরে নারীকে ব্যক্তি নয়, পণ্য বা বস্তু হিসেবে দেখার প্রবণতা অপমান, হুমকি, চরিত্রহনন এবং গোপনীয়তা লঙ্ঘনের ঘটনা বাড়াচ্ছে। নারীর ডিজিটাল অংশগ্রহণ সীমিত হয়, আত্মপ্রকাশে ভয় তৈরি হয় এবং অনলাইন পরিসর নারীর জন্য আরও অনিরাপদ হয়ে ওঠে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে ছবি বিকৃতি, ভুয়া অশ্লীল কনটেন্ট তৈরি এবং ব্ল্যাকমেইলের মতো ঘটনা নতুন ঝুঁকি হিসেবে উঠে এসেছে। প্রযুক্তিনির্ভর সহিংসতার ধরন আরও জটিল ও ক্ষতিকর হয়, আর বিদ্যমান প্রতিকারব্যবস্থা অনেক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত থাকে না। দলিত সম্প্রদায়, প্রতিবন্ধী নারী, দরিদ্র ও অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠী তথ্য, দক্ষতা ও প্রতিকারব্যবস্থায় সীমিত প্রবেশাধিকারের কারণে তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। ডিজিটাল বৈষম্য আরও গভীর হয় এবং প্রযুক্তিনির্ভর সহিংসতা বিদ্যমান সামাজিক অসমতাকে তীব্রতর করে। লোকলজ্জা, ভুক্তভোগীকেই দায়ী করার সংস্কৃতি, পারিবারিক চাপ এবং সামাজিক মর্যাদা হারানোর আশঙ্কায় অনেক ঘটনা আনুষ্ঠানিকভাবে রিপোর্ট হয় না। প্রকৃত পরিস্থিতির পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় না, নীতি ও কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নে তথ্যগত ঘাটতি তৈরি হয় এবং অপরাধীরা দায়মুক্তির সুযোগ পায়।
অতিরিক্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার মানুষের আবেগীয় সংবেদনশীলতা, মনোযোগ এবং সামাজিক প্রতিক্রিয়ার ধরনে প্রভাব ফেলছে। সহিংসতা, অপমান ও গোপনীয়তা লঙ্ঘনের ঘটনাকে স্বাভাবিক বা তুচ্ছ মনে করার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। জেলা পর্যায়ে প্রতিরোধ, তাৎক্ষণিক সহায়তা, মনোসামাজিক সাপোর্ট, আইনি সহায়তা এবং রেফারেল ব্যবস্থার মধ্যে সমন্বিত কাঠামো দুর্বল। ভুক্তভোগীরা সময়মতো প্রয়োজনীয় সহায়তা পান না এবং প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ বিচ্ছিন্ন ও কম কার্যকর থাকে।
জেলা পর্যায়ের সংলাপ থেকে প্রাপ্ত তথ্য, পর্যবেক্ষণ ও অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা (টিএফজিবিভি) প্রতিরোধ, প্রতিকার ও ন্যায়বিচারপ্রাপ্তি জোরদারে নিম্নোক্ত সুপারিশসমূহ প্রণয়ন করা হয়েছে। টিএফজিবিভির পৃথক সংজ্ঞা ও নীতিগত স্বীকৃতি নিশ্চিত করা বিদ্যমান আইনি ও নীতিগত কাঠামোর মধ্যে টিএফজিবিভিকে পৃথক, স্পষ্ট ও কার্যকরভাবে সংজ্ঞায়িত করতে হবে, যাতে প্রতিরোধ, সুরক্ষা, তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় অভিন্ন ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়। জেলা ও উপজেলা কমিটির কার্যপরিধিতে টিএফজিবিভি অন্তর্ভুক্ত করা নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটি, আইসিটি কমিটি এবং সাইবার অপরাধ প্রতিরোধ কমিটির কার্যক্রমে
টিএফজিবিভিকে যুক্ত করে তাদের দায়িত্ব, সমন্বয় ও ফলোআপ ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ।
জেলা পর্যায়ে নিয়মিত অংশীজন পর্যালোচনা সভা চালু করা টিএফজিবিভির প্রবণতা, প্রতিকারব্যবস্থা, প্রতিবন্ধকতা ও অগ্রগতি মূল্যায়নে জেলা পর্যায়ে অন্তত বছরে একবার বহুপক্ষীয় পর্যালোচনা সভা আয়োজন করা উচিত। সরকারি কর্মকর্তা ও মাঠপর্যায়ের দায়িত্বপ্রাপ্তদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা সরকারি কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সমাজসেবা কর্মকর্তা, শিক্ষা প্রশাসন এবং স্থানীয় সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের জন্য টিএফজিবিভি, ডিজিটাল অধিকার, ডিজিটাল প্রমাণ ও ভুক্তভোগীবান্ধব সেবা বিষয়ে কাঠামোবদ্ধ প্রশিক্ষণ চালু করা প্রয়োজন। জেলা লিগ্যাল এইডে টিএফজিবিভি সহায়তা ডেস্ক চালু করা জেলা লিগ্যাল এইড কার্যালয়ে টিএফজিবিভি-সংক্রান্ত আইনি পরামর্শ, রেফারেল ও প্রাথমিক সহায়তার জন্য বিশেষায়িত ডেস্ক স্থাপন করা উচিত। সমন্বিত রেফারেল পাথওয়ে প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন পুলিশ, সাইবার ইউনিট, স্বাস্থ্যসেবা, ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার, লিগ্যাল এইড, সমাজসেবা অধিদপ্তর এবং বেসরকারি সহায়তাকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক রেফারেল পাথওয়ে গড়ে তুলতে হবে, যাতে ভুক্তভোগী দ্রুত ও সমন্বিত সেবা পান।
ডিজিটাল প্রমাণ সংগ্রহ ও তদন্ত সক্ষমতা বৃদ্ধি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের পুলিশ ও তদন্ত কর্মকর্তাদের ডিজিটাল প্রমাণ শনাক্তকরণ, সংগ্রহ, সংরক্ষণ, ডকুমেন্টেশন ও ফরেনসিক বিশ্লেষণে প্রশিক্ষিত করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম সরবরাহ করা জরুরি।
মামলা গ্রহণে অনীহা দূর করতে জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা জোরদার টিএফজিবিভি-সংক্রান্ত অভিযোগ গ্রহণে গড়িমসি বা নিরুৎসাহিত করার প্রবণতা বন্ধে প্রশাসনিক নজরদারি ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন। দূরবর্তী অঞ্চলের ভুক্তভোগীদের জন্য ভার্চুয়াল সাপোর্ট ও শুনানি ব্যবস্থা বিবেচনা যেসব এলাকায় সশরীরে সেবা গ্রহণ বা বিচারপ্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ কঠিন, সেখানে ভার্চুয়াল সহায়তা, সাক্ষ্যগ্রহণ বা শুনানির সুযোগ সম্প্রসারণ করা যেতে পারে। বিশেষায়িত আইনজীবী প্যানেল গঠন সাইবার অপরাধ ও টিএফজিবিভি-সংক্রান্ত মামলা পরিচালনায় দক্ষ আইনজীবীদের একটি বিশেষ প্যানেল গঠন করা প্রয়োজন।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সহপাঠক্রমিক কার্যক্রম ডিজিটাল নিরাপত্তা অন্তর্ভুক্ত করা স্কুল, কলেজ এবং কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উপযোগী সহপাঠক্রমিক কার্যক্রম ডিজিটাল নিরাপত্তা, অনলাইন আচরণ, সাইবার আইন এবং জেন্ডার-সংবেদনশীলতা অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। অভিভাবক ও পরিবারের জন্য ডিজিটাল প্যারেন্টিং নির্দেশনা চালু করা পরিবারভিত্তিক সচেতনতা কার্যক্রমের মাধ্যমে অভিভাবকদের প্যারেন্টাল কন্ট্রোল, নিরাপদ ডিভাইস ব্যবহার, অনলাইন ঝুঁকি এবং সন্তানদের সঙ্গে আস্থাভিত্তিক যোগাযোগ বিষয়ে ওরিয়েন্টেশন প্রদান করা প্রয়োজন। ধর্মীয়, সামাজিক ও স্থানীয় নেতৃত্বকে সম্পৃক্ত করা ধর্মীয় নেতা, শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি, ইমাম, পুরোহিত, সমাজনেতা ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের সম্পৃক্ত করে সম্মানজনক ডিজিটাল আচরণ, নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ এবং নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহারে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে।
ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারকে স্থানীয় সচেতনতা কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারের মাধ্যমে নিয়মিত উঠান বৈঠক, ওরিয়েন্টেশন, তথ্যসেবা এবং ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীর জন্য সহায়তামূলক প্রচারণা চালানো যেতে পারে। ডিভাইস ও সিম নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় নিরাপত্তা বার্তা সংযোজন মোবাইল ফোন, সিম কার্ড ও ইন্টারনেটসেবা প্রদানের পর্যায়ে নিরাপদ ব্যবহার, ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা ও প্রতারণা প্রতিরোধবিষয়ক বাধ্যতামূলক নির্দেশিকা যুক্ত করা উচিত। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ কাঠামো গড়ে তোলা প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে ক্ষতিকর কনটেন্ট অপসারণ, ভুয়া আইডি শনাক্তকরণ এবং জরুরি অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য কৌশলগত প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন। ইন্টারনেট সেবাদাতা ও বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করা ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান, মোবাইল অপারেটর এবং ডিজিটাল ডিভাইস বিক্রেতাদের টিএফজিবিভি প্রতিরোধে দায়িত্বশীল অংশীজন হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
নিরাপদ ডিজিটাল ব্যবহার বিষয়ক ভোক্তা নির্দেশিকা চালু করা ডিভাইস বিক্রয় ও সেবা প্রদানের সময় ভোক্তাদের জন্য সংক্ষিপ্ত, ব্যবহারযোগ্য এবং সহজবোধ্য নিরাপত্তা নির্দেশিকা প্রদান বাধ্যতামূলক করার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। জেলা পর্যায়ে র্যাপিড রেসপন্স বা যৌথ মনিটরিং সেল গঠন জেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে পুলিশ, সাইবার ইউনিট, স্বাস্থ্যসেবা, লিগ্যাল এইড, নারী সহায়তা সংস্থা ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি সমন্বিত দ্রুত প্রতিক্রিয়া কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন। এনজিও ও নাগরিক সমাজের নজরদারি ও সহায়তাকারী ভূমিকা জোরদার করা স্থানীয় এনজিও, নারী সংগঠন, যুব সংগঠন ও নাগরিক প্ল্যাটফর্মগুলোকে সচেতনতা, প্রাথমিক সহায়তা, রেফারেল ও সামাজিক মনিটরিংয়ে আরও কার্যকরভাবে সম্পৃক্ত করা দরকার
যুব ও নারী সংগঠনকে ফ্রন্টলাইন কমিউনিটি রেসপন্স ইউনিট হিসেবে গড়ে তোলা যুব ক্লাব ও নারী সংগঠনগুলোর সদস্যদের স্বেচ্ছাসেবী পর্যায়ে প্রশিক্ষিত করে কমিউনিটি-ভিত্তিক প্রতিরোধ ও সহায়তা কাঠামোয় যুক্ত করা যেতে পারে। গণমাধ্যমে অনুসন্ধানী ও জনস্বার্থভিত্তিক রিপোর্টিং উৎসাহিত করা টিএফজিবিভির কারণ, ধরন, প্রতিবন্ধকতা, বিচারপ্রাপ্তির সীমাবদ্ধতা এবং সুরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা বিষয়ে প্রমাণভিত্তিক প্রতিবেদন প্রকাশে গণমাধ্যমকে উৎসাহিত করা প্রয়োজন। ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষায় কারিগরি অনুশীলন জনপ্রিয় করা টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন, শক্তিশালী পাসওয়ার্ড, প্রাইভেসি সেটিংস, নিরাপদ ব্যাকআপ এবং প্রতারণা শনাক্তকরণসংক্রান্ত ব্যবহারিক জ্ঞান তৃণমূল পর্যায়ে ছড়িয়ে দিতে হবে।
ডিজিটাল প্রমাণ সংরক্ষণ বিষয়ে পরিবারকে সচেতন করা হয়রানি বা অপরাধের ঘটনায় স্ক্রিনশট, লিংক, ভয়েস রেকর্ড, কল লগ বা মেসেজ মুছে না ফেলে সেগুলো সংরক্ষণের গুরুত্ব সম্পর্কে পরিবার ও কমিউনিটিকে সচেতন করা প্রয়োজন। ভুক্তভোগীকে দোষারোপের সংস্কৃতি প্রতিরোধ করা সামাজিক ও পারিবারিক পর্যায়ে ভুক্তভোগীকেই দায়ী করার প্রবণতা নিরুৎসাহিত করে সহানুভূতিশীল, সুরক্ষামূলক ও সহায়ক মনোভাব গড়ে তুলতে কমিউনিটি পর্যায়ে প্রচারণা প্রয়োজন।
প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষায়িত সচেতনতা ও সহায়তা উদ্যোগ গ্রহণ দলিত সম্প্রদায়, ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, হিজড়া জনগোষ্ঠী এবং অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীর জন্য উপযোগী ভাষা, পদ্ধতি ও মাধ্যম ব্যবহার করে বিশেষ সচেতনতা ও সহায়তা কাঠামো তৈরি করা উচিত।
পরিশেষে বলা যায়, প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা (টিএফজিবিভি) মোকাবিলা আজ কেবল একটি আইনগত বা প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ নয়; এটি মানবাধিকার, ন্যায়বিচার, নিরাপত্তা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক ডিজিটাল পরিবেশ নিশ্চিত করার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত ইস্যু।
জেলা পর্যায়ের মাল্টিস্টেকহোল্ডার সংলাপগুলোতে উঠে আসা অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশ থেকে স্পষ্ট যে, এ ধরনের সহিংসতা প্রতিরোধ ও প্রতিকার নিশ্চিত করতে সমন্বিত, অধিকারভিত্তিক এবং বহুপক্ষীয় উদ্যোগের কোনো বিকল্প নেই। বিশেষ করে কার্যকর রেফারেল পাথওয়ে প্রতিষ্ঠা, সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের কারিগরি সক্ষমতা বৃদ্ধি, ভুক্তভোগীবান্ধব সেবা জোরদার এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে এও প্রতীয়মান হয় যে, স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিচারসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম, প্রযুক্তি-সংশ্লিষ্ট অংশীজন এবং কমিউনিটি পর্যায়ের নেতৃত্বকে একটি অভিন্ন কাঠামোর আওতায় এনে সমন্বিতভাবে কাজ করতে না পারলে টিএফজিবিভি মোকাবিলায় কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জন সম্ভব হবে না। সুতরাং, সংলাপ থেকে প্রাপ্ত সুপারিশসমূহকে বাস্তবতার আলোকে অগ্রাধিকারভিত্তিতে বাস্তবায়ন করা গেলে প্রযুক্তিনির্ভর সহিংসতা হ্রাস, ভুক্তভোগীদের জন্য সুরক্ষা ও ন্যায়বিচারপ্রাপ্তি জোরদার, এবং দীর্ঘমেয়াদে একটি নিরাপদ, জবাবদিহিমূলক ও বৈষম্যহীন ডিজিটাল পরিবেশ গড়ে তোলার পথে তা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।
হীরেন পণ্ডিত
কলামিস্ট ও গবেষক