টিএফজিবিভি মোকাবিলায় কন্টেন্ট ক্রিয়েটর ও অনলাইন কর্মীদের ভূমিকা – হীরেন পণ্ডিত

0

ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তার মানুষের মতপ্রকাশ, তথ্যপ্রাপ্তি, সামাজিক যোগাযোগ এবং সৃজনশীল অংশগ্রহণের নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ডিজিটাল কন্টেন্ট ক্রিয়েটররা এখন জনমত গঠন, তথ্য প্রচার, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং স্থানীয় বাস্তবতা তুলে ধরার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক, ইনস্টাগ্রামসহ বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে তাদের উপস্থিতি দ্রুত বাড়ছে, এবং স্থানীয় জনগণের কাছে তাদের প্রভাবও ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে। তবে এই ডিজিটাল পরিসরের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা বা টিএফজিবিভি নতুন মাত্রা পেয়েছে। অনলাইন হয়রানি, সাইবার বুলিং, ডক্সিং, পরিচয় চুরি, ব্যক্তিগত তথ্য বা ছবি ফাঁস, ব্ল্যাকমেইল, ভুয়া বা বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট ছড়িয়ে দেওয়া, ডিপফেক এবং নারীবিদ্বেষী অপপ্রচার এখন ডিজিটাল নিরাপত্তার বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। এসব সহিংসতার শিকার হচ্ছেন বিশেষ করে নারী, কিশোরী, নারী সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী, নারী রাজনীতিক, কন্টেন্ট ক্রিয়েটর এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সদস্যরা।

জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের ডিজিটাল কন্টেন্ট ক্রিয়েটররা বর্তমানে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত একটি প্রভাবশালী যোগাযোগমাধ্যমে পরিণত হয়েছেন। তাদের কনটেন্ট দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, স্থানীয় ভাষা ও প্রেক্ষাপটে গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করে এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রচলিত গণমাধ্যমের বাইরে থাকা মানুষদের কাছেও পৌঁছাতে সক্ষম হয়। ফলে টিএফজিবিভি প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধি, বিভ্রান্তিকর তথ্য মোকাবিলা, নিরাপদ ডিজিটাল আচরণ প্রচার এবং ভুক্তভোগী-সংবেদনশীল দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে এই কন্টেন্ট ক্রিয়েটররা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন।
কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, অনেক কন্টেন্ট ক্রিয়েটরের মধ্যে টিএফজিবিভির ধারণা, ঝুঁকি, আইনগত দিক, ডিজিটাল নিরাপত্তা, তথ্য যাচাই এবং জেন্ডার-সংবেদনশীল কনটেন্ট তৈরির বিষয়ে যথেষ্ট প্রস্তুতি নেই। অনেক সময় না বুঝেই ক্ষতিকর ভাষা, ভিক্টিম-ব্লেমিং, গোপনীয়তা লঙ্ঘন, যাচাইবিহীন তথ্য প্রচার বা উত্তেজক উপস্থাপন ডিজিটাল সহিংসতাকে আরও বাড়িয়ে তোলে। অন্যদিকে, ইতিবাচক ও সচেতনতামূলক কনটেন্টেরও বড় ঘাটতি রয়েছে, বিশেষ করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে। এই প্রেক্ষাপটে জেলাভিত্তিক ডিজিটাল কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্য অবহিতকরণ কর্মশালা সময়োপযোগী ও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ। এই কর্মশালার মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীরা টিএফজিবিভির প্রকৃতি, ঝুঁকি, সামাজিক ও মানসিক প্রভাব, দায়িত্বশীল ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরির নীতিমালা, তথ্য যাচাই, অনলাইন নিরাপত্তা এবং ইতিবাচক অ্যাডভোকেসিভিত্তিক বার্তা তৈরির দক্ষতা সম্পর্কে ব্যবহারিক ধারণা অর্জন করেন। এর মাধ্যমে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে একটি নিরাপদ, সম্মানজনক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ডিজিটাল পরিবেশ গড়ে তুলতে স্থানীয় কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের সম্পৃক্ততা আরও শক্তিশালী হবে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের ডিজিটাল কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা, যাতে তারা প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা (টিএফজিবিভি) প্রতিরোধ, সচেতনতা বৃদ্ধি, দায়িত্বশীল ডিজিটাল কনটেন্ট নির্মাণ এবং নিরাপদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ডিজিটাল উন্নয়ন প্রচারে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন।
টিএফজিবিভি বিষয়ে জ্ঞান ও সচেতনতা বৃদ্ধি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের ডিজিটাল কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের মধ্যে প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার ধারণা, ধরন, ঝুঁকি, প্রভাব, প্রতিরোধ ও প্রতিকার সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা তৈরি করা। জেন্ডার-সংবেদনশীল ও দায়িত্বশীল কনটেন্ট নির্মাণে সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য অংশগ্রহণকারীদের এমনভাবে প্রস্তুত করা, যাতে তারা কনটেন্ট তৈরির ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীর মর্যাদা, গোপনীয়তা, মানবিকতা এবং জেন্ডার-সংবেদনশীলতা বজায় রাখতে পারেন। ডিজিটাল নিরাপত্তা ও তথ্য যাচাই দক্ষতা জোরদার ডিজিটাল নিরাপত্তা, অনলাইন ঝুঁকি মোকাবিলা, অপতথ্য শনাক্তকরণ, ফ্যাক্ট-চেকিং এবং দায়িত্বশীল ডিজিটাল প্রকাশনা বিষয়ে অংশগ্রহণকারীদের ব্যবহারিক দক্ষতা উন্নয়ন করা। ইতিবাচক সামাজিক বার্তা ও প্রতিরোধমূলক প্রচারণা উৎসাহিত করাসহ টিএফজিবিভি প্রতিরোধ, নিরাপদ অনলাইন আচরণ, সম্মানজনক ডিজিটাল যোগাযোগ এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় ইতিবাচক, সচেতনতামূলক ও প্রভাবশালী কনটেন্ট তৈরিতে অংশগ্রহণকারীদের উৎসাহিত করা।
স্থানীয় পর্যায়ে নেটওয়ার্কিং ও সমন্বিত উদ্যোগের ভিত্তি শক্তিশালী করা ডিজিটাল কন্টেন্ট ক্রিয়েটর, গণমাধ্যম পেশাজীবী, নাগরিক সমাজ, প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট অংশীজনের মধ্যে সংলাপ, সহযোগিতা ও জ্ঞান বিনিময়ের সুযোগ সম্প্রসারণ করা। প্ল্যাটফর্মের ইতিবাচক ব্যবহার করে অংশগ্রহণকারী ইউটিউবার ও কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের নিজস্ব প্ল্যাটফর্ম ও ফলোয়ারদের ব্যবহার করে টিএফজিবিভি মোকাবিলা বিষয়ক বার্তা প্রচারের মাধ্যমে সমাজে ব্যাপক সচেতনতা বাড়ানো।
বিএনএনআরসির উদ্যোগ ও ব্যবস্থাপনায় ময়মনসিংহ, কুষ্টিয়া, বরিশাল এবং পটুয়াখালী জেলার সদরভিত্তিক অবহিতকরণ কর্মশালাগুলো অনুষ্ঠিত হয়, যা মোট ৬টি জেলার কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত। কর্মশালায় স্থানীয় ডিজিটাল কন্টেন্ট ক্রিয়েটর, ইউটিউবার ও সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সারগণ অংশ নেন। অংশগ্রহণমূলক কাঠামোয় পরিচালিত এসব কর্মশালায় তাত্ত্বিক উপস্থাপনার পাশাপাশি স্থানীয় বাস্তবতা ও প্রেক্ষাপটের আলোকে সচেতনতামূলক ও দায়িত্বশীল ডিজিটাল কন্টেন্ট তৈরির কৌশল এবং কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করা হয়।
বাংলাদেশ ডিজিটাল রূপান্তরের যাত্রায় এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে অবস্থান করছে এর সাথে সাথে বাড়ছে প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা (টিএফজিবিভি)। বৈশ্বিক তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির (আইসিটি) দ্রুত অগ্রগতি এবং ডিজিটাল জনসেবার ক্রমবর্ধমান চাহিদা এ প্রক্রিয়াকে আরও জরুরি ও প্রাসঙ্গিক করে তুলেছে। বাংলাদেশের উন্নয়ন অভিযাত্রায় ডিজিটাল রূপান্তর এখন আর একটি বিকল্প নয়, বরং টেকসই অগ্রগতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। এই উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে শাসন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা, সেবাপ্রদানকে আরও দক্ষ ও স্বচ্ছ করা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করা সম্ভব হচ্ছে। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই বিভিন্ন ডিজিটাল উদ্যোগ হাতে নিয়েছে, যা জনসেবা সহজীকরণ থেকে শুরু করে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতিশীলতায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।
শাসনব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে আইসিটি একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। ই-গভর্নেন্স কার্যক্রম চালু হওয়ার ফলে সরকারি সেবায় জবাবদিহিতা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং নাগরিকরা দ্রুত ও স্বচ্ছ সেবা পাচ্ছেন। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে নীতি প্রণয়ন, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সেবা প্রদান প্রক্রিয়ায় নাগরিকদের সম্পৃক্ততা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সেবাপ্রদান উন্নয়নের ক্ষেত্রে প্রযুক্তি নির্ভর সমাধান একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। অনলাইন সেবা, মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন ও ডিজিটাল হেল্পডেস্কের মাধ্যমে নাগরিকরা ঘরে বসেই প্রয়োজনীয় সরকারি ও বেসরকারি সেবা পাচ্ছেন। এর ফলে সময় ও খরচ কমছে এবং মানুষের জীবনমান উন্নত হচ্ছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ব্যক্তি ও থানা পর্যায়ে জেলা ভিত্তিক তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ ও প্রয়োগ পরিমাপ বিষয়ক সর্বশেষ পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়- দেশে বর্তমানে কম্পিউটার ব্যবহারকারী ৯.১%, ইন্টারনেট ব্যবহার করছেন ৫৬.২%, মোবাইল ফোন ব্যবহারকারী ৯৮.৯%, স্মার্ট ফোন ব্যবহারকারী ৭২.৪%, ফিক্সড ফোন ব্যবহারকারী ০.৮%, রেডিও ব্যবহার করেন ১৫.১%, টেলিভিশন ৫৮.৯%, এবং বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী ৯৮.৯%। এই তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়েছে পরিসংখ্যানের জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০২৫ প্রতিবেদন হতে। তথ্য প্রযুক্তির বিকাশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এর অপব্যবহারও বেড়ে চলেছে, বেড়েছে প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডার ভিত্তিক সহিংসতাও। সমাজের নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ প্রতিনিয়ত অনলাইনে সহিংসতার শিকার হচ্ছেন, যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যকই নারী।
ডিসেম্বর, ২০২৪ এ ইউএনএফপিএ প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী বিশ্বে প্রতি ৩ জনের মধ্যে ২ জন নারী জীবনে অন্তত একবার অনলাইন সহিংসতার শিকার। বাংলাদেশে প্রায় ৮৯% নারী ও কন্যা শিশু এই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন। ৯-১৪ বছর বয়স থেকেই টিএফজিবিভির ঝুঁকিতে থাকার প্রবণতা শুরু হয় এবং ১৮-৩০ বছরের তরুণীরা সবচেয়ে বেশি টিএফজিবিভির শিকার হন। ৭৫% ভুক্তভোগীই তাদের পরিবারকে এ বিষয়ে জানান না এবং কোন ধরণের আইনি ব্যবস্থাও নেন না। টিএফজিবিভি প্রতিকারে বাংলাদেশ সরকারের সবচাইতে কার্যকরী উদ্যোগ পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন (পিসিএসডিব্লিউ)-এর রিপোর্ট (২০২৪) অনুযায়ী, তাদের কাছে এ পর্যন্ত ৬০ হাজারের বেশি অভিযোগ দায়ের হয়েছে, যার- ৪১% ডক্সিংয়ের শিকার, ১৮% ফেসবুক আইডি হ্যাক, ১৭% ব্ল্যাকমেইল, ৯% ইমপার্সোনেশন, ৮% সাইবার বুলিংজনিত সমস্যা নিয়ে অভিযোগ করেছেন।

জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ) ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত ‘ভায়োলেন্স অ্যাগেইনস্ট উইমেন সার্ভে ২০২৪’ বাংলাদেশের নারীদের ডিজিটাল নিরাপত্তা নিয়ে এক গভীর উদ্বেগের ছবি তুলে ধরেছে। এই জরিপে দেখা গেছে, টিএফজিবিভির সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছেন তরুণীরা। ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে এই হার সর্বোচ্চ ১৬ শতাংশ; ২৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে ১৩.৩ শতাংশ; আর ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী কিশোরীদের মধ্যে ১১.৯ শতাংশ। অর্থাৎ বয়স যত কম, অনলাইনে ঝুঁকিও তত বেশি। তবে এ সহিংসতা শুধু তরুণীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; জরিপে দেখা গেছে, ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী নারীদের মধ্যেও ১.৪ শতাংশ এ ধরনের সহিংসতার শিকার হয়েছেন।
শিক্ষা ও প্রযুক্তি ব্যবহারের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে সহিংসতার চরিত্রও বদলেছে। জরিপে দেখা যায়, উচ্চশিক্ষিত নারীরাই তুলনামূলক বেশি টিএফজিবিভির লক্ষ্যবস্তু হচ্ছেন। স্নাতক বা তদূর্ধ্ব ডিগ্রিধারী নারীদের মধ্যে এর হার ১৮.৮ শতাংশ, এইচএসসি পাস নারীদের মধ্যে ১৬.৭ শতাংশ, আর এসএসসি পাস কিশোরীদের মধ্যে ১২.৮ শতাংশ। বিপরীতে, কমশিক্ষিত বা শিক্ষা থেকে বঞ্চিত নারীদের মধ্যে এ হার তুলনামূলক কম। বৈবাহিক অবস্থার বিচারে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছেন বিবাহিত হলেও স্বামীর থেকে আলাদা বা দূরে বসবাসরত নারীরা; তাঁদের মধ্যে এই সহিংসতার হার ১৯.৮ শতাংশ।
এই জরিপের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো, প্রযুক্তিনির্ভর সহিংসতা শুধু ডিভাইস-ব্যবহারকারীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার করেন না, এমন নারীদের মধ্যেও ৩.৪ শতাংশ কোনো না কোনোভাবে টিএফজিবিভির শিকার হয়েছেন। এই তথ্য স্পষ্ট করে যে, প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত সহিংসতা কেবল অনলাইন পরিসরের সমস্যা নয়; এটি অফলাইনে থাকা নারীদের গোপনীয়তা, মর্যাদা ও নিরাপত্তাকেও সমানভাবে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।এভাবে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে নারীর অংশগ্রহণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে অর্থনীতিসহ দেশের উন্নয়নের সব ক্ষেত্রে। কেননা দেশের অর্ধেক জনসংখ্যাকে অনলাইনে অনিরাপদ রেখে অগ্রগতির কোনো লক্ষ্য পূরণ করাই সম্ভব নয়। তাই প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডার-ভিত্তিক সহিংসতা সম্পর্কে ব্যাপক সচেতনতা বাড়ানো এবং সশ্লিষ্ট অংশীজন তথা সরকারি-বেসরকারী প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, নাগরিক সমাজ সংগঠন, আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, জনপ্রতিনিধি, নীতি-নির্ধারক এবং গণমাধ্যমের ভূমিকা জোরালো করার মাধ্যমে আমাদের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোতে সকলের বিশেষ গ্রামীণ নারীর জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা ভীষণভাবে জরুরি। আর তাই প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডার ভিত্তিক সহিংসতা এবং এটি প্রতিরোধ ও প্রশমনে আমাদের করণীয় সম্পর্কে জানা বোঝা একান্তভাবে জরুরি। জনসেবার ডিজিটালায়ন, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তির বিস্তার এবং উদ্ভাবননির্ভর অর্থনৈতিক পরিবর্তনের ফলে প্রযুক্তি আজ উন্নয়ন প্রক্রিয়ার একটি অপরিহার্য উপাদানে পরিণত হয়েছে। ই-গভর্ন্যান্স, অনলাইন সেবা, মোবাইল অ্যাপ ও বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম নাগরিকসেবা সহজতর করেছে, সময় ও ব্যয় কমিয়েছে এবং অংশগ্রহণের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে।
তবে এই অগ্রগতির পাশাপাশি প্রযুক্তির অপব্যবহারও ক্রমেই বাড়ছে। ডিজিটাল পরিসর এখন শুধু যোগাযোগ, শিক্ষা, তথ্যপ্রাপ্তি বা ব্যবসার ক্ষেত্র নয়; এটি হয়রানি, ব্ল্যাকমেইল, পরিচয় জালিয়াতি, ছবি বিকৃতি, ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস এবং নানামুখী সহিংসতারও ক্ষেত্র হয়ে উঠছে। এসব সহিংসতার শিকার হচ্ছেন অনেকেই, তবে নারী ও মেয়েরা তুলনামূলকভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
এর প্রভাব পড়ছে তাঁদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, অনলাইন অংশগ্রহণ, মানসিক সুস্থতা, শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং নেতৃত্ব বিকাশের ওপর। ফলে একটি নিরাপদ, ন্যায়ভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ডিজিটাল সমাজ গড়ে তুলতে প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধ এখন জরুরি নীতিগত ও সামাজিক অগ্রাধিকার।
প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা, সংক্ষেপে টিএফজিবিভি, বলতে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বা অন্যান্য প্রযুক্তিগত মাধ্যম ব্যবহার করে জেন্ডারের ভিত্তিতে কোনো ব্যক্তি, বিশেষ করে নারী ও মেয়েদের বিরুদ্ধে সংঘটিত সহিংসতা, হয়রানি, হুমকি, নজরদারি, অপমান, শোষণ বা ক্ষতিকর আচরণকে বোঝায়। এ ধরনের সহিংসতা আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে প্রযুক্তিনির্ভর হতে পারে এবং তা এক বা একাধিক ব্যক্তি দ্বারা সংঘটিত হতে পারে।
টিএফজিবিভির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, এটি কেবল অনলাইন পরিসরে সীমাবদ্ধ নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মেসেজিং অ্যাপ, মোবাইল ফোন, জিপিএস ট্র্যাকিং ডিভাইস, রেকর্ডিং যন্ত্র এবং অন্যান্য প্রযুক্তিগত মাধ্যম ব্যবহার করেও এ ধরনের সহিংসতা সংঘটিত হতে পারে। সে কারণে এটি শুধু প্রযুক্তিগত ঝুঁকির বিষয় নয়; বরং জেন্ডার বৈষম্য, ক্ষমতার অসমতা এবং ডিজিটাল নিরাপত্তাহীনতার একটি বহুমাত্রিক প্রকাশ।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ এনজিওস নেটওয়ার্ক ফর রেডিও এন্ড কমিউনিকেশন (বিএনএনআরসি) বাস্তবায়ন করছে ‘স্ট্রেনদেনিং রেজিলিয়েন্স এগেইনস্ট টেকনোলজি ফ্যাসিলিটেটেড জেন্ডার বেইসড ভায়োলেন্স (টিএফজিবিভি) অ্যান্ড প্রমোটিং ডিজিটাল ডেভেলপমেন্ট’ প্রকল্পটি। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে নাগরিকতা: সিভিক এনগেজমেন্ট ফান্ড (সিইএফ) কর্মসূচির অধীনে এতে অর্থায়ন করেছে সুইজারল্যান্ড দূতাবাস, গ্লোবাল এ্যাফেয়ার্স কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। কারিগরি সহায়তা দিয়েছে জিএফএ কনসালটিং গ্রুপ।
এর মাধ্যমে দেশের জেলা পর্যায়ে এবং তৃণমূলে কমিউনিটি রেডিওকে সম্পৃক্ত করে সচেতনতা বৃদ্ধি, সক্ষমতা উন্নয়ন, ভুক্তভোগীদের সহায়তা এবং বহুপক্ষীয় অংশীদারত্ব জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই উদ্যোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, স্থানীয় পর্যায়ে সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা জোরদার করা এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তোলা। স্থানীয় পর্যায়ে নাগরিক সমাজ সংগঠনগুলো সচেতনতা সৃষ্টি, ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে চিহ্নিত করা, প্রাথমিক সহায়তা ও রেফারেল প্রদান, সামাজিক সংলাপ সৃষ্টি এবং নীতিপর্যায়ে স্থানীয় বাস্তবতা তুলে ধরার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু প্রযুক্তিনির্ভর জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার ধরন, প্রভাব, প্রতিরোধ কৌশল, আইনি প্রতিকার, ডিজিটাল প্রমাণ সংরক্ষণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সেবার সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের বিষয়ে এ সংগঠনগুলোর সক্ষমতা আরও জোরদার করা প্রয়োজন। জেলাভিত্তিক এই কর্মশালার লক্ষ্য হলো প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা (টিএফজিবিভি) বিষয়ে ধারণাগত স্পষ্টতা, প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি এবং কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের কার্যকর সম্পৃক্ততার সক্ষমতা বৃদ্ধি করা। জেলা পর্যায়ে টিএফজিবিভি মোকাবিলায় প্রধান চ্যালেঞ্জ প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা কী, এর ধরন কী এবং কোথায় বা কীভাবে অভিযোগ করতে হয়, সে বিষয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে স্পষ্ট ধারণার অভাব রয়েছে। অনেক ভুক্তভোগী আনুষ্ঠানিক প্রতিকার ব্যবস্থার বাইরে থেকে যান, নীরবতা বৃদ্ধি পায় এবং সহিংসতার প্রকৃত মাত্রা আড়ালে থেকে যায়। সুনির্দিষ্ট আইন, নীতিমালা ও নির্দেশনার ঘাটতি টিএফজিবিভি মোকাবিলায় পৃথক ও সুস্পষ্ট আইনগত সংজ্ঞা, নীতিগত দিকনির্দেশনা এবং বাস্তবায়নযোগ্য প্রোটোকলের অভাব লক্ষ্য করা গেছে।
বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি আইন রয়েছে যা টিএফজিবিভি-এর ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যেতে পারে, যার মধ্যে রয়েছে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন (২০০০), পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন (২০১২) এবং সম্প্রতি প্রণীত সাইবার নিরাপত্তা আইন (২০২৬)। এই আইনগুলো একটি ভিত্তি প্রদান করলেও বড় ধরনের ফাঁকফোকর রয়ে গেছে। আইন প্রয়োগ প্রায়শই অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, আইনি প্রক্রিয়া দীর্ঘ ও জটিল হতে পারে এবং অনেক ভুক্তভোগী তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন নন। তাছাড়া, প্রযুক্তির দ্রুত বিবর্তন বিশেষ করে এআই-চালিত অপব্যবহার বিদ্যমান আইনি কাঠামোকে ছাড়িয়ে গেছে। ক্রমাগত আপডেট এবং শক্তিশালী প্রয়োগ পদ্ধতি ছাড়া, আইনি ব্যবস্থা যে সমস্যাটি সমাধান করতে চায় তার চেয়ে পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকে।
তবে রাজনৈতিক স্তরে কিছু ইতিবাচক লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। ২০২৬ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) অনলাইন লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আইনি সুরক্ষা জোরদার করার অঙ্গীকার করেছে। এই ইশতেহারে আইসিটি খাতের সম্প্রসারণ, উদীয়মান প্রযুক্তিতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের জন্য জনবল প্রস্তুত করার ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে। তবে এই প্রতিশ্রুতিগুলোকে অবশ্যই কার্যকর পদক্ষেপে রূপান্তরিত করতে হবে। টিএফজিবিভি মোকাবিলায় কেবল নীতিগত বিবৃতি নয়, বরং টেকসই বিনিয়োগ, সমন্বয় এবং জবাবদিহিতা প্রয়োজন। চ্যালেঞ্জ বড়, কিন্তু সম্ভাবনাও বিশাল। যে ডিজিটাল প্রযুক্তি ক্ষতির কারণ হতে পারে, সেই প্রযুক্তিই আবার কণ্ঠস্বরকে শক্তিশালী করতে, সংহতি গড়ে তুলতে এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারে। পথ সুস্পষ্ট। এখন প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের সদিচ্ছা। ক্রমবর্ধমান এবং পরিবর্তনশীল এই হুমকির মুখে গণমাধ্যমকে শুধু পর্যবেক্ষকের ভূমিকায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; তাকে নেতৃত্ব দিতে হবে সাহস, সততা এবং মানবাধিকারের প্রতি অটল অঙ্গীকার নিয়ে। তবেই আমরা এমন একটি ডিজিটাল সমাজ গড়ে তুলতে পারব, যা শুধু সংযুক্ত নয়, বরং নিরাপদ, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং সবার জন্য ন্যায়ভিত্তিক।

লেখক : হীরেন পণ্ডিত
কলামিস্ট ও গবেষক

আপনি এগুলোও দেখতে পারেন

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না.