পিরোজপুরে প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডার-ভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধে কন্টেন্ট ক্রিয়েটর ও ইউটিউবারদের অবহিতকরণ সভা অনুষ্ঠিত
নিজস্ব প্রতিনিধি : ডিজিটাল রূপান্তরের এই সময়ে প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা বা টিএফজিবিভি (Technology-Facilitated Gender-Based Violence) একটি ক্রমবর্ধমান সামাজিক ও মানবাধিকারগত উদ্বেগ হিসেবে সামনে এসেছে। বিশেষ করে নারী ও কন্যাশিশুরা এ ধরনের সহিংসতার ঝুঁকিতে বেশি থাকায় সচেতনতা বৃদ্ধি, প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ এবং কার্যকর সমন্বয় এখন সময়ের দাবি।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ এনজিওস নেটওয়ার্ক ফর রেডিও অ্যান্ড কমিউনিকেশন (বিএনএনআরসি) এবং পিরোজপুর গণ উন্নয়ন সমিতি-এর উদ্যোগে আজ ২৩ এপ্রিল ২০২৬ আয়োজন করা হয়, ‘প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডার-ভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধ ও প্রশমনে, এবং ইতিবাচক ডিজিটাল আন্দোলন গড়ে তোলায় স্থানীয় কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের ভূমিকা’ বিষয়ক অবহিতকরণ সভা। সভায় পিরোজপুরের ৩০ জন স্থানীয় কন্টেন্ট ক্রিয়েটর অংশগ্রহণ করেন যাদের সম্মিলিত ফলোয়ার সংখ্যা প্রায় ২৬ লাখের বেশি।
অবহিতকরণ সভার উদ্দেশ্য টিএফজিবিভি এবং টিএফজিবিভি মোকাবিলা সম্পর্কে স্থানীয় কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের ধারণা প্রদান এবং এ বিষয়ক কন্টেন্ট তৈরিতে তাদের উদ্বুদ্ধ করা। অংশগ্রহণকারী কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে টিএফজিবিভি মোকাবিলা বিষয়ক বার্তা প্রচারের মাধ্যমে সচেতনতা বাড়ানো।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তানজিলা কবির ত্রপা। উল্লেখ্য, বিএনএনআরসি “Strengthening Resilience against Technology-Facilitated Gender-Based Violence and Promoting Digital Development”/ ‘স্ট্রেনদেনিং রেজিলিয়েন্স এগেইনস্ট টেকনোলজি ফেসিলিটেটেড জেন্ডার বেইজড ভায়োলেন্স (টিএফজিবিভি) এন্ড প্রমোটিং ডিজিটাল ডেভেলপমেন্ট’ প্রকল্পের আওতায় এই অবহিতকরণ সভা আয়োজন করেছে। প্রকল্পটি ‘নাগরিকতা: সিভিক এনগেজমেন্ট ফান্ড (সিইএফ)’ কর্মসূচির অংশ, যা সুইজারল্যান্ড, গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নে এবং জিএফএ কনসালটিং গ্রুপের কারিগরি সহায়তায় বাস্তবায়িত হচ্ছে।
সভায় পিরোজপুর গণ উন্নয়ন সমিতির নির্বাহী পরিচালক জিয়াউল আহসান বলেন, বর্তমানে কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো রেগুলেশন বা ফ্রেমওয়ার্ক নেই, যার কারণে অনেক সময় জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা কঠিন হয়। সম্প্রতি যে সাইবার সিকিউরিটি আইন পাস হয়েছে, আশা করা যায় এর মাধ্যমেই কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন বা রেগুলেশন তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হবে।
বিএনএনআরসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এএইচএম বজলুর রহমান বলেন, ২০০১ সালে বাংলাদেশের আইসিটি পলিসি শুরু হওয়ার পর গত পঁচিশ বছরে ডিজিটাল খাতে আমাদের অনেক অর্জন রয়েছে। তবে বাস্তব চিত্র হলো, দেশে এখনো ৪৪ শতাংশ জনগোষ্ঠী ইন্টারনেট ব্যবহার করেন না। ডিজিটাল বৈষম্যের এই চিত্র বর্তমান যুগে আমাদের সার্বিক উন্নয়নযাত্রাকে কিছুটা পেছনে টেনে ধরেছে।
জনাব মোঃ নুরুল ইসলাম, ক্যাপাসিটি ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট এক্সপার্ট, নাগরিকতা: সিভিক এনগেজম্যান্ট ফান্ড (সিইএফ) তার বক্তব্যে বলেন, কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের কাছে আমাদের একটাই চাওয়া—আপনারা এমন কন্টেন্ট তৈরি করুন, যা নারী-পুরুষ, জাতি, ধর্ম, আদিবাসী ও বয়স নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষের প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা নিশ্চিত করে।
অবহিতকরণ সভায় কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্য নিরাপদ, জেন্ডার সংবেদনশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কন্টেন্ট তৈরির কৌশল এবং ফেসবুক ও ইউটিউব কমিউনিটি গাইডলাইনসহ ডিজিটাল আচরণের নৈতিক মানদণ্ড নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।
আলোচকবৃন্দ ডিজিটাল ডেভেলপমেন্ট এবং টিএফজিবিভি বিষয়ে জনসচেতনতায় জোর দেন এবং পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন (হেল্পলাইন ০১৩২০০০০৮৮৮, ইমেইল- [email protected]) সহ সরকারের অন্যান্য কার্যকর উদ্যোগ ও সেবা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেন।
বিশেষ অতিথি আল আমিন (ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মমকর্তা, পিরোজপুর সদর) বলেন, আপনারা যারা ফানি কন্টেন্ট বা ভ্লগ তৈরি করেন, তারা বিনোদনের ফাঁকে সাইবার অপরাধ, আর্থিক প্রতারণা এবং জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার বিষয়গুলো মানুষের সামনে তুলে ধরুন। আপনাদের এই ছোট উদ্যোগ আমাদের সমাজকে আরও সুন্দর, নিরাপদ ও বাসযোগ্য করে তুলবে।
অনলাইনে হয়রানি বা অন্যায়ের শিকার হলে ভুক্তভোগী কার কাছে গিয়ে কথা বলবে বা কোথায় অভিযোগ জানাবে, তা অনেকেই জানেন না। আবার জানলেও অনেকে লজ্জায় বা আত্মবিশ্বাসের অভাবে চুপ থাকেন। ভুক্তভোগীদের কোথায় গিয়ে সঠিক প্রতিকার পেতে হবে, সে বিষয়ে তাদের সচেতন করা ও সাহস যোগানোই সবচেয়ে বেশি জরুরি।
জেলা তথ্য অফিসের সহকারী পরিচালক, সাইফুদ্দিন আল মাদানী বলেন, সহিংসতা মানে শুধু নারীদের প্রতি সহিংসতা নয়, পুরুষদের প্রতিও অবমাননাকর বিষয়গুলো এর অন্তর্ভুক্ত। অনেক ফানি কন্টেন্টে দেখা যায় স্বামীদের গায়ে হাত তোলা হচ্ছে বা হাস্যকরভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। এগুলো সমাজে ভুল বার্তা দেয়। তাই যেকোনো কন্টেন্ট আপলোড করার আগে ভাবতে হবে, এর সামাজিক প্রভাব ইতিবাচক নাকি নেতিবাচক।
সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন জেলা আইসিটি অফিসার আবুল হাসান। তিনি বলেন, একজন প্রকৃত কন্টেন্ট ক্রিয়েটরের জন্য ‘তথ্যের অখণ্ডতা’ বা ইনফরমেশন ইন্টিগ্রিটি বজায় রাখা অতীব গুরুত্বপূর্ণ। কেবল একটি ভিডিও বানিয়ে ছেড়ে দিলেই হবে না; কন্টেন্ট প্রকাশের আগে তার সত্যতা, বস্তুনিষ্ঠতা ও নৈতিক দিক যাচাই করা আপনাদের দায়িত্ব। আপনাদের এই সৃজনশীল পেশা এবং সাইবার নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে, উপজেলা পর্যায়ের আইসিটি ও সাইবার অপরাধ প্রতিরোধ কমিটিতে কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের অন্তর্ভুক্ত (Co-opt) করার জন্য আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করব। এছাড়া, আপনারা যেহেতু কন্টেন্ট তৈরির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে রেমিট্যান্স যোদ্ধা হিসেবে ভূমিকা রাখছেন, তাই আপনাদের ‘ফ্রিল্যান্সিং কার্ড’ প্রাপ্তিতেও আমাদের দপ্তর থেকে সার্বিক সহযোগিতা করা হবে
সভার প্রধান অতিথি অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তানজিলা কবির ত্রপা বলেন, আমাদের নারী কন্টেন্ট ক্রিয়েটররা অনলাইনে কতখানি হয়রানির শিকার হন এবং কারা তাদের হয়রানি করছে, তা জানা অত্যন্ত জরুরি এবং সে অনুযায়ী যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। আপনি আপনার পরিবারের নারীদের সাথে যে সম্মানজনক আচরণ করেন, বাইরের নারীদের প্রতিও একই আচরণ বজায় রাখা প্রয়োজন।
পিরোজপুর জেলার কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের নিয়ে আয়োজিত এই অবহিতকরণ সভা শেষে উপস্থিত প্রত্যেকে সার্টিফিকেট ও বিএনএনআরসি’র তৈরি কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্য নৈতিক নীতিমালার খসড়া গ্রহণ করেন। তাঁরা ভবিষ্যতে তাঁদের কন্টেন্টের মাধ্যমে ডিজিটাল উন্নয়ন প্রচারণা এবং টিএফজিবিভি প্রতিরোধে সচেতনতামূলক কন্টেন্ট তৈরি করে নারীদের জন্য একটি নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ গড়ে তোলার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।