বিএনএনআরসির উদ্যোগে দুই দিনব্যাপী ‘স্কুল অব টিএফজিবিভি’ অনুষ্ঠিত
নিজস্ব প্রতিনিধি : বাংলাদেশ এনজিওস নেটওয়ার্ক ফর রেডিও অ্যান্ড কমিউনিকেশন, বিএনএনআরসির উদ্যোগে দুই দিনব্যাপী ‘স্কুল অব টিএফজিবিভি: প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা: প্রতিরোধ, প্রশমন ও করণীয় এবং ডিজিটাল উন্নয়ন প্রচারণা’ শীর্ষক বিশেষ প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত হয়েছে। ১২ ও ১৩ মে রাজধানীর একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলা থেকে ৯০ জন অংশগ্রহণকারী অংশ নেন।

বিএনএনআরসি ‘স্ট্রেনদেনিং রেজিলিয়েন্স এগেইনস্ট টেকনোলজি ফেসিলিটেটেড জেন্ডার বেইসড ভায়োলেন্স অ্যান্ড প্রমোটিং ডিজিটাল ডেভেলপমেন্ট’ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্পটি নাগরিকতা: সিভিক এনগেজমেন্ট ফান্ড, সিইএফ কর্মসূচির আওতায় বাস্তবায়িত হচ্ছে। এতে অর্থায়ন করছে সুইজারল্যান্ড, গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে জিএফএ কনসালটিং গ্রুপ।
অনুষ্ঠানে নাগরিকতা: সিইএফ কর্মসূচির প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কর্মসূচির টিম লিডার ড. আদি ওয়াকার, ক্যাপাসিটি ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট এক্সপার্ট মো. নুরুল ইসলাম, কমিউনিকেশন অ্যান্ড আউটরিচ এক্সপার্ট জারিন তাসনিম এবং জেন্ডার অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি এক্সপার্ট ফরিদুল হক।

জারিন তাসনিম নাগরিকতা: সিইএফ কর্মসূচির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য তুলে ধরেন। তিনি নাগরিক পরিসর সংরক্ষণ এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার গুরুত্ব নিয়েও আলোচনা করেন।
নাগরিকতা: সিইএফ কর্মসূচির টিম লিডার ড. আদি ওয়াকার বলেন, বিশ্বে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী নারীদের একটি বড় অংশ অনলাইনে কোনো না কোনোভাবে যৌন হয়রানি বা নির্যাতনের শিকার হন। ডিজিটাল সহিংসতা মোকাবিলায় তিনি তিনটি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দেন। এগুলো হলো অপরাধীদের চ্যালেঞ্জ করা, সমাজের মনমানসিকতা ও প্রতিষ্ঠানগত কাঠামোতে পরিবর্তন আনা এবং সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে ইতিবাচক পরিবর্তন নিশ্চিত করা।
অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্য ও পটভূমি উপস্থাপন করেন কোর্স কো-অর্ডিনেটর ও ডেভেলপমেন্ট কনসালট্যান্ট রেহান উদ্দিন আহমেদ রাজু। তিনি বলেন, ‘স্কুল অব টিএফজিবিভি’র মূল লক্ষ্য হলো প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার ধরন, ঝুঁকি, প্রভাব ও প্রতিরোধ কৌশল সম্পর্কে বহুপক্ষীয় অংশীজনদের জ্ঞান ও সক্ষমতা বৃদ্ধি করা। একই সঙ্গে বিদ্যমান আইন, নীতি ও সুরক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো, নিরাপদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ডিজিটাল পরিবেশ গঠনে করণীয় চিহ্নিত করা এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মধ্যে সংলাপ, অংশীদারত্ব ও সমন্বিত পদক্ষেপের ভিত্তি শক্তিশালী করাও এ কর্মসূচির উদ্দেশ্য।
প্রশিক্ষণে ‘জেন্ডার-এর মৌলিক ধারণা এবং উন্নয়ন কার্যক্রমে জেন্ডারের প্রভাব’ নিয়ে আলোচনা করেন জেন্ডার বিশেষজ্ঞ সেলিনা কেয়া। ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক ডিজিটাল উন্নয়ন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম: ধারণা ও প্রকারভেদ’ বিষয়ে আলোচনা করেন বিএনএনআরসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এএইচএম বজলুর রহমান।
‘টিএফজিবিভি: সংজ্ঞা, ধরন, নেতিবাচক প্রভাব ও চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক অধিবেশন পরিচালনা করেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক এবং বিএনএনআরসির টিএফজিবিভি বিষয়ক প্রশিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, টিওটিপ্রাপ্ত প্রশিক্ষক শাহনাজ মুন্নী। ‘ইনফরমেশন ইন্টিগ্রিটি এবং ফ্যাক্ট-চেকিং’ বিষয়ে আলোচনা করেন বিএনএনআরসির প্রকল্প সমন্বয়কারী হীরেন পণ্ডিত।
আইনগত বিষয় নিয়ে বক্তব্য দেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার তাসনুভা শেলী। তিনি সাইবার অপরাধের বিচারে ডিজিটাল ফরেনসিক প্রমাণের গুরুত্ব, সাইবার ট্রাইব্যুনালে মামলার সাজার হার কম থাকার কারণ এবং ভুক্তভোগীকে দোষারোপ করার সামাজিক প্রবণতা নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি বলেন, আইনি ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ছাড়া প্রযুক্তির মাধ্যমে সংঘটিত সহিংসতা মোকাবিলা করা কঠিন।
আইনগত বিষয় নিয়ে আরও আলোচনা করেন অ্যাডভোকেট জেবা মোবাশ্বিরা। তিনি সাইবার অপরাধের আওতাভুক্ত বিভিন্ন অপরাধ, প্রযোজ্য ধারা, শাস্তির মেয়াদ এবং সংশ্লিষ্ট সেবা সম্পর্কে অংশগ্রহণকারীদের ধারণা দেন। তিনি বলেন, ভুক্তভোগীকে দোষারোপ করার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। প্রতিটি ভুক্তভোগীর বিচার পাওয়ার পূর্ণ আইনি অধিকার রয়েছে।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. জাহিদুল ইসলাম ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারে সচেতনতার গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বিএনএনআরসির সচেতনতামূলক কার্যক্রম মফস্বল ও প্রান্তিক পর্যায়ে আরও সম্প্রসারণের প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, সাইবার পরিসরে ব্যক্তিগত ছবি বা তথ্য ফাঁসের অনেক ঘটনা পারস্পরিক সম্পর্কের অবনতির সঙ্গে যুক্ত। তাই শুধু আইন নয়, সচেতনতাও সুরক্ষার বড় উপায়।
আইসিটি বিভাগের উপসচিব ফাতেমা তুল জান্নাত বলেন, ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত সহিংসতা থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়। তিনি বলেন, ‘নেটিকেট’ বা ডিজিটাল শিষ্টাচার সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে অনেক সময় একজন সাধারণ নাগরিকও ভুয়া তথ্য শেয়ার করে অজান্তেই অপরাধের অংশীদার হয়ে যেতে পারেন।
সমাপনী পর্বে বিভিন্ন জেলা থেকে আসা অংশগ্রহণকারীরা তাঁদের অভিজ্ঞতা ও প্রতিক্রিয়া তুলে ধরেন। তাঁরা জানান, প্রশিক্ষণ থেকে অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতা নিজ নিজ এলাকায় টিএফজিবিভি প্রতিরোধে প্রচার ও সচেতনতামূলক কার্যক্রমে কাজে লাগাবেন। অংশগ্রহণকারীরা বলেন, জেন্ডারভিত্তিক বৈষম্য, ডিজিটাল হয়রানির আইনি প্রতিকার এবং অনলাইন নিরাপত্তা সম্পর্কে তাঁরা নতুনভাবে জানতে ও বুঝতে পেরেছেন। প্রশিক্ষণ শেষে সবার মাঝে সার্টিফেকেট বিতরণ করা হয়।
বিএনএনআরসি মনে করে, প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধে স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি, আইনি জ্ঞানের প্রসার এবং অংশীজনদের সক্রিয় অংশগ্রহণ জরুরি। নিরাপদ, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তুলতে এ ধরনের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।