শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিনিমিনি: বান্দরবান বালাঘাটায় দায়সারা ছাত্রাবাস নির্মাণ কাজে অনিয়মের অভিযোগ

0

মো:শিপন, জেলা প্রতিনিধি, বান্দরবান : পাহাড়ি জনপদের পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে নির্মিত হচ্ছিল এই ছাত্রাবাস। বান্দরবান সদর উপজেলার বালাঘাটায় বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের বাস্তবায়নে শিক্ষক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান এর লাইসেন্স নিয়ে ঠিকাদার মোঃ মুস্তাক এর তত্ত্ববধানে প্রায় ৭০ লাখ টাকার ব্যায়ে নির্মাণাধীন এই ছাত্রাবাসটিতে রডের বদলে বাঁশ না থাকলেও, বালুর আধিক্য আর ৩ নম্বর ইটের কংকর ব্যবহার এখন ওপেন সিক্রেট।

ব্যাবহৃত কংকরের তিন ভাগের দুই ভাগই রাবিশ এর ভরপুর এবং ব্যবহারকৃত লোকাল বালিতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণ মাটি ও ময়লা এতে করে নিয়মের কোনো তোয়াক্কাই করছেন না এলাকাবাসীর জোরালো অভিযোগ।

সাংবাদিকরা ঠিকাদার মোহাম্মদ মোস্তাক এর কাছে মুঠোফোনের মাধ্যমে কাজের অনিয়মের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এই কাজ আমার না,,,
তবে, বান্দরবান জেলা পরিষদের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মোঃ মেহেদী -র কাছে এই ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি জানান এই কাজ ঠিকাদার মোহাম্মদ মোস্তাক ই করছেন।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ভবনের পিলার থেকে শুরু করে ছাদ ঢালাই—সবখানেই অনিয়মের ছাপ। স্থানীয়দের অভিযোগ, শুরু থেকেই কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন তুললেও কোনো কর্ণপাত করেনি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। বরং প্রভাবশালীদের নাম ভাঙিয়ে দ্রুত কাজ শেষ করার তোড়জোড় চলছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা জানিয়েছেন: “আমরা দেখছি এখানে রাতারাতি কাজ শেষ করার চেষ্টা চলছে।সিমেন্টের চেয়ে বালু বেশি দিচ্ছে। আমাদের সন্তানরা এখানে থাকবে, যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। ছাদের রড বাঁধা শেষ হওয়ার আগেই করা হচ্ছে ছাদ ঢালায়ের কাজ। এমনকি পুরাতন ছাদের সাথে সংযুক্ত না করেই তড়িঘড়ি করে দেওয়া হচ্ছে ছাদ ঢালায়।

স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন বলেন, যে ভাবে ছাদের কাজ করা হচ্ছে মনে হয় না ভবনটি বেশিদিন টিকতে পারবে কারণ কাজের গুণগতমান নিয়ে আমারা খুবই চিন্তিত।ঠিকাদারকে আমরা বারবার বলার পরও তিনি কোন কথাই মানছেন না এবং প্রকল্পের দেখাশোনা করার দায়িত্বে থাকা পরিষদের যিনি কর্মকর্তা রয়েছেন মেহেদী সাহেব আমার মনে হয় উনি ঠিকাদারের কাছ থেকে কমিশন বাণিজ্য নিয়ে এই কাজ তড়িঘড়ি করে শেষ করে দিচ্ছেন।

বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ এর চেয়ারম্যান মহাদয় এর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বালাঘাটা স্থানীয় সচেতন মহলের জোর দাবি, উক্ত প্রকল্পের কাজ অতি দ্রুত বন্ধ রেখে সঠিক তদন্তের মাধ্যমে পুনরায় নতুন ঠিকাদার দিয়ে টেকসই ও মজবুত ভাবে করানো হোক। বর্তমান ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিয়মের কোনো তোয়াক্কাই করছেন না সুতরাং এমন কাজ না করা উত্তম।

বান্দরবান জেলা পরিষদের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মোঃ মেহেদী -র কাছে এই কাজের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এই কাজে কোন প্রকার অনিয়ম হচ্ছে না বরং আমার সক্রিয় উপস্থিতিতে কাজগুলো করা হচ্ছে। “ছাদের রডের সাথে সংযুক্ত না করেই ঢালাই দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি এ বিষয়ে কোন সঠিক উত্তর দিতে পারেননি এবং তিনি এ প্রসঙ্গে এড়িয়ে যান।
এই আবাসিক হোস্টেলের দায়িত্বে থাকা শিক্ষকের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন আমি বারবার এই অনিয়ম কাজের বাধা দেওয়ার পরও উনারা কাজ করে গেছেন আমার কথা কোন পাত্তাই দিচ্ছে না।

একজন শিক্ষার্থী জানিয়েছেন: “পাহাড় থেকে আমরা শহরে পড়তে আসি আশ্রয়ের আশায়। কিন্তু ভবনের যে অবস্থা দেখছি, তাতে এখানে থাকতে যে কেও ভয় পেতে বাধ্য হবে।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, পাহাড়ি অঞ্চলে ভূ-প্রকৃতি বিবেচনায় ভবনের ভিত্তি বা ফাউন্ডেশন মজবুত হওয়া জরুরি। কিন্তু এখানে মানা হয়নি বিল্ডিং কোড। সরকারি বড় অংকের বাজেট বরাদ্দ থাকলেও তার প্রতিফলন নেই এই কাঠামোতে। অভিযোগের আঙুল ঠিকাদারের দিকে থাকলেও ক্যামেরার সামনে কথা বলতে রাজি হননি প্রকল্পের সাথে যুক্ত কোনো কর্মকর্তা।

ছাত্রাবাসটি হওয়ার কথা ছিল শত শত শিক্ষার্থীর নিরাপদ আবাস। কিন্তু দুর্নীতির কালো থাবায় এর ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত। প্রশ্ন উঠেছে, এই ‘দায়সারা’ নির্মাণের দায় শেষ পর্যন্ত নেবে কে? সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কঠোর তদারকি ও তদন্তই পারে এই লুটপাট বন্ধ করতে।”

পাহাড়ের প্রান্তিক মানুষের ট্যাক্সের টাকায় নির্মিত এই ভবনটি কি আদৌ শিক্ষার্থীদের কল্যাণে আসবে, নাকি কোনো সিন্ডিকেটের পকেট ভারী করার মাধ্যম হয়েই থাকবে—এমনটাই এখন বড় প্রশ্ন বান্দরবানবাসীর।

আপনি এগুলোও দেখতে পারেন

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না.