সমন্বিত সড়ক নিরাপত্তা আইন খসড়া নিয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত
নিজস্ব প্রতিনিধি : সমন্বিত সড়ক নিরাপত্তা আইন খসড়া, সেফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচ এবং সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে গণমাধ্যমের ভূমিকা ও অংশীদারিত্ব নিয়ে ঢাকায় সাংবাদিক ও যোগাযোগকর্মীদের জন্য দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
শনিবার (১৬ মে ) রাজধানীর মোহাম্মদপুরে ওয়াইডব্লিউসিএ প্রশিক্ষণ কক্ষে বাংলাদেশ এনজিওস নেটওয়ার্ক ফর রেডিও অ্যান্ড কমিউনিকেশন বা বিএনএনআরসি এ প্রশিক্ষণের আয়োজন করে। প্রশিক্ষণের শিরোনাম ছিল “সমন্বিত সড়ক নিরাপত্তা আইন (খসড়া): গণমাধ্যমের ভূমিকা ও অংশীদারিত্ব”।
প্রশিক্ষণে প্রিন্ট, টেলিভিশন, অনলাইন নিউজ পোর্টাল ও সংবাদ সংস্থার ২০ জন সাংবাদিক অংশ নেন। এতে সড়ক নিরাপত্তার জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট, সেফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচ, সমন্বিত সড়ক নিরাপত্তা আইন খসড়ার অগ্রগতি, আচরণগত ঝুঁকির কারণ, গণমাধ্যমের নীতি-অধিপরামর্শমূলক ভূমিকা এবং তথ্যভিত্তিক ও বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন তৈরির কৌশল নিয়ে আলোচনা করা হয়।
প্রশিক্ষণে আলোচক হিসেবে অংশ নেন ব্র্যাক রোড সেফটি প্রোগ্রামের প্রোগ্রাম ম্যানেজার খালিদ মাহমুদ, গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটরের কান্ট্রি কো-অর্ডিনেটর ড. শরিফুল আলম এবং বিএনএনআরসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এ এইচ এম বজলুর রহমান।
আলোচকেরা বলেন, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সড়ক নিরাপত্তা এখন শুধু পরিবহন খাতের বিষয় নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, নগর ব্যবস্থাপনা, আইনের শাসন, অর্থনীতি, সামাজিক নিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকারের সঙ্গে যুক্ত একটি জরুরি উন্নয়ন ইস্যু। সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি, আহত হওয়া, পঙ্গুত্ব, পারিবারিক আর্থিক বিপর্যয় এবং উৎপাদনশীলতা হারানোর ঘটনা দেশের সামগ্রিক উন্নয়নকে প্রভাবিত করছে।
তাঁরা বলেন, টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট বা এসডিজি ৩-এর টার্গেট ৩.৬-এ ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী সড়ক দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু ও আহতের সংখ্যা অর্ধেকে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। একইভাবে এসডিজি ১১-এর টার্গেট ১১.২-এ সবার জন্য নিরাপদ, সাশ্রয়ী, সহজপ্রাপ্য ও টেকসই পরিবহনব্যবস্থা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে গণপরিবহন সম্প্রসারণ এবং নারী, শিশু, প্রবীণ ব্যক্তি, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর নিরাপদ চলাচলের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রশিক্ষণে বলা হয়, বিদ্যমান সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ সড়ক ব্যবস্থাপনায় কিছু অগ্রগতি আনলেও সড়ক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি পূর্ণাঙ্গ ও সমন্বিত আইনি কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা এখন আরও স্পষ্ট হয়েছে। সড়ক প্রকৌশল, নিরাপদ যানবাহন, নিরাপদ সড়ক ব্যবহারকারী, নিরাপদ গতি, আইন প্রয়োগ, জনসচেতনতা এবং দুর্ঘটনা-পরবর্তী জরুরি সেবার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় ছাড়া সড়ক দুর্ঘটনা কমানো কঠিন।
আলোচকেরা আরও বলেন, পরিবহন, স্বাস্থ্য, পুলিশ, শিক্ষা, স্থানীয় সরকার, অবকাঠামো এবং গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন খাতের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। একটি সমন্বিত সড়ক নিরাপত্তা আইন এসব খাতকে একটি কার্যকর কাঠামোর আওতায় এনে দায়িত্ব, সমন্বয় ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারে।
প্রশিক্ষণে গণমাধ্যমের ভূমিকার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। বক্তারা বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে গণমাধ্যমের ভূমিকা শুধু দুর্ঘটনার খবর প্রকাশে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। দুর্ঘটনার কারণ, ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ, আইন ও নীতির ঘাটতি, সড়ক অবকাঠামোর দুর্বলতা, গতি নিয়ন্ত্রণ, হেলমেট ও সিটবেল্ট ব্যবহার, শিশুর নিরাপত্তা, পথচারীর অধিকার এবং দুর্ঘটনা-পরবর্তী সেবার বিষয়গুলো নিয়ে তথ্যভিত্তিক, বস্তুনিষ্ঠ ও বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন তৈরি জরুরি।
এ এইচ এম বজলুর রহমান বলেন, সড়ক নিরাপত্তা এখন বৈশ্বিক উন্নয়ন আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার। আগামী ২০-২১ জুলাই ২০২৬ নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিতব্য বৈশ্বিক সড়ক নিরাপত্তা উন্নয়নবিষয়ক জাতিসংঘের উচ্চপর্যায়ের বৈঠক বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। এ বৈঠকের আগে জাতীয় পর্যায়ে সড়ক নিরাপত্তা আইন, নীতি, অর্থায়ন, প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় এবং গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে আরও গভীর আলোচনা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে জনসচেতনতা গড়ে তোলা, আচরণগত পরিবর্তন উৎসাহিত করা, প্রমাণভিত্তিক নীতি আলোচনায় সহায়তা করা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জবাবদিহির আওতায় আনতে গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
উল্লেখ্য, বিএনএনআরসি রোড সেফটি কোয়ালিশন বাংলাদেশ-এর অন্যতম সদস্য হিসেবে ২০২২ সাল থেকে সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। Constructive Road Safety Journalism in Bangladesh এবং Strengthening Road Safety Legislation on Key Behavioral Risk Factors in Bangladesh through Media Development প্রকল্পের মাধ্যমে বিএনএনআরসি সমন্বিত সড়ক নিরাপত্তা আইন বিষয়ে অধিপরামর্শ, নীতি গবেষণা, গণমাধ্যম সম্পৃক্ততা এবং সাংবাদিকদের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে কাজ করে আসছে।
ইতিমধ্যে বিএনএনআরসি প্রিন্ট, টেলিভিশন ও অনলাইন গণমাধ্যমের ৬৫ জন সাংবাদিককে সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে প্রতিবেদন তৈরির প্রশিক্ষণ দিয়েছে। পাশাপাশি ৩৫ জন সাংবাদিককে সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে ইন-ডেপথ ও অনুসন্ধানধর্মী প্রতিবেদন তৈরির জন্য ফেলোশিপ প্রদান করা হয়েছে। ফেলোশিপের আওতায় সাংবাদিকেরা মোট ১০৫টি তথ্যভিত্তিক, বস্তুনিষ্ঠ ও বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন প্রকাশ ও প্রচার করেছেন। ফেলোশিপ চলাকালে নয়জন সিনিয়র সাংবাদিক মেন্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
প্রশিক্ষণ শেষে অংশগ্রহণকারীরা সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ক প্রমাণভিত্তিক সাংবাদিকতা, জনস্বার্থমূলক প্রতিবেদন এবং সমন্বিত সড়ক নিরাপত্তা আইন বিষয়ে গণমাধ্যমের ভূমিকা আরও জোরদার করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।