সম্মেলনের শেষ দিনে ‘শিক্ষা, নারী অধিকার, কূটনীতি ও তরুণদের ভাবনায় ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের রূপরেখা’ নিয়ে আলোচনা
বাংলাদেশ সম্মেলন ২০২৬
নিজস্ব প্রতিনিধি : জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশের রাষ্ট্র পুনর্গঠন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালীকরণ এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক, জবাবদিহিমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আয়োজিত ‘বাংলাদেশ সম্মেলন ২০২৬’ এর দ্বিতীয় ও শেষ দিনে চারটি গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হয়।
রাজধানীর ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইডিইবি)-এ অনুষ্ঠিত এই সম্মেলন আয়োজন করে সেন্টার ফর পলিসি অ্যানালাইসিস অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি। এ সম্মেলনের প্রধান প্রতিপাদ্য “জুলাই বিপ্লবোত্তর রাষ্ট্র গঠন: আকাঙ্ক্ষা ও বাস্তবতা”।
দিনের প্রথম অধিবেশনে ‘শিক্ষা ব্যবস্থার বর্তমান বাস্তবতায় একটি সমন্বিত ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থার রূপরেখা’ শীর্ষক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. আমির মুহাম্মদ নসরুল্লাহ। তিনি তাঁর গবেষণাপত্রে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে রাষ্ট্র গঠনের কেন্দ্রীয় ভিত্তি হিসেবে পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি যুক্তি দেন, বর্তমান বহু-ধারার শিক্ষা ব্যবস্থা, দক্ষতার অমিল, পরীক্ষাকেন্দ্রিক মূল্যায়ন, দুর্বল গবেষণা সংস্কৃতি এবং শিল্প-শিক্ষা বিচ্ছিন্নতার কারণে বাংলাদেশ বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে। তিনি ফিনল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, তাইওয়ান, ভারত ও পাকিস্তানের শিক্ষা সংস্কারের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশের জন্য একটি সমন্বিত, দক্ষতাভিত্তিক, গবেষণানির্ভর ও প্রযুক্তি-সক্ষম শিক্ষা রূপান্তরের রোডম্যাপ উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, শিক্ষা শুধু ডিগ্রি অর্জনের বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্র গঠন, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং জ্ঞানভিত্তিক বাংলাদেশ গঠনের ভিত্তি। তিনি বলেন যে সামাজিক স্থিতিশীলতা, শিক্ষার বিস্তার ও নৈতিকতা সংরক্ষণে মাদ্রাাসা শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তাই মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিশ্চিতে প্রয়োজনীয় সংস্কার করতে হবে। তিনি শিক্ষা সংস্কারে নীতি ধারাবাহিকতার উপর গুরুত্বারোপ করেন। এই সেশনে সভাপতিত্ব করেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ভাইস-চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আবদুর রব। আলোচনায় অংশ নেন ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন কুইন্সল্যান্ডের এমেরিটাস প্রফেসর ড. শাহজাহান খান, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সাবেক সিনিয়র সচিব ড. খ ম কবিরুল ইসলাম, বুয়েটের প্রফেসর ড. সৈয়দা সুলতানা রাজিয়া, নর্থ-সাউথ ইউনিভার্সিটির প্রফেসর ড. হাফিজ আব্দুর রহমান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইসমাইল এবং অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির গবেষক মুহাম্মদ উবায়দুল হক।
দিনের দ্বিতীয় অধিবেশনে ‘বাংলাদেশে নারী অধিকার রাজনীতি’ বিষয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি মালয়েশিয়ার প্রফেসর ড. মো. মাহমুদুল হাসান। গবেষক ও শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. মো. মাহমুদুল হাসান তাঁর প্রবন্ধে যুক্তি দিয়েছেন যে, নারী অধিকার প্রশ্নকে অনেক সময় প্রকৃত নারী কল্যাণের পরিবর্তে রাজনৈতিক, আদর্শিক ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা হয়েছে। তিনি মনে করেন, উপনিবেশবাদ থেকে শুরু করে সমকালীন আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও ‘নারী অধিকার’কে ক্ষমতা ও প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের উদাহরণ রয়েছে। তিনি বলেন রাজনৈতিক প্রশয়ে ‘ধর্ষণের সেঞ্চুরি’ উদযাপন করা হয়েছে এবং এর প্রতিবাদে ১৯৯৯ সালে জাহাঙ্গীরগনর বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘এন্টি-রেপ মুভমেন্ট’ এর কথাও তিনি সবাইকে স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি দাবি করেন, নারী অধিকার আন্দোলনের একটি অংশ রাজনৈতিক প্রভাব ও দলীয় অবস্থানের কারণে অনেক ক্ষেত্রে ‘নির্বাচিত’ প্রতিবাদ করে, যা আন্দোলনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে। একই সঙ্গে তিনি ইসলাম ও নারী অধিকার সম্পর্কিত প্রচলিত ধারণাগুলোর পুনর্মূল্যায়নের আহ্বান জানিয়ে বলেন, নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় রাজনৈতিক পক্ষপাত, আদর্শিক বিভাজন ও ধর্মবিদ্বেষের পরিবর্তে গবেষণাভিত্তিক, ন্যায়সঙ্গত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা প্রয়োজন। এই সেশনে সভাপতিত্ব করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের চেয়ারপার্সন প্রফেসর ড. সৈয়দা লাসনা কবীর। এতে আলোচনায় অংশ নেন নর্থ-সাউথ ইউনিভার্সিটির প্রফেসর ড. নাজমুন নাহার, বিশিষ্ট ইসলামিক স্কলার ও শিক্ষাবিদ ড. মীর মনজুর মাহমুদ, জেন্ডার গবেষক ড. সুমাইয়া রাবেয়া এবং লেখক ও গবেষক নূরেন নির্ভানা বৃষ্টি।
তৃতীয় অধিবেশন ‘বৈদেশিক সম্পর্ক, অতীত অভিজ্ঞতা এবং ভবিষ্যৎ দৃষ্টিভঙ্গি’ বিষয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব রাষ্ট্রদূত আবদুল মোতালেব সরকার। তিনি তাঁর গবেষণাপত্রে বলেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির বাস্তবতায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে আরও জাতীয় স্বার্থভিত্তিক, ভারসাম্যপূর্ণ, অর্থনৈতিক কূটনীতিকেন্দ্রিক এবং ভবিষ্যতমুখী হতে হবে। তিনি উল্লেখ করেন, অতীতে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনার অভাব, দলীয় স্বার্থের প্রাধান্য এবং বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষায় সীমাবদ্ধতা বাংলাদেশের কূটনীতিকে দুর্বল করেছে। ভবিষ্যতের জন্য তিনি অর্থনৈতিক কূটনীতিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার, ভারত-চীন-যুক্তরাষ্ট্রসহ প্রধান শক্তিগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক, রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান, জলবায়ু কূটনীতি, ব্লু-ইকোনমি, ডিজিটাল কূটনীতি, অভিবাসন কূটনীতি এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তাঁর মতে, আগামী দিনের বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি হতে হবে–স্মার্ট, স্ট্রাটেজিক, স্যাসটেইনেবল এবং সেলফ্ কনফিডেন্ট–যার ভিত্তি হবে জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব। এই সেশনে সভাপতিত্ব করেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ হাসান নাসির, এনডিসি, পিএসসি (অব.)। আলোচনায় অংশ নেন বিশিষ্ট রাষ্ট্র বিজ্ঞানী ড. দিলারা চৌধুরী, নর্থ-সাউথ ইউনিভার্সিটির প্রফেসর ড. মাহবুবুর রহমান, বিশিষ্ট ভূ-রাজনীতি বিশ্লেষক ও সাবেক ক্যারিয়ার ডিপ্লোম্যাট সাকিব আলী এবং আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ভূ-রাজনীতি ও মাইগ্রেশন বিষয়ক গবেষক ইউনিভার্সিটি অব ব্রুনেই দারুসসালামের প্রফেসর ড. এ কে এম আহসান উল্লাহ।
সম্মেলনের শেষ অধিবেশনে ‘তরুণ সমাজের আকাঙ্ক্ষা ও বাস্তবতা’-শীর্ষক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন তরুণ শিক্ষাবিদ ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষক মো. বুরহান উদ্দিন নোমান। তিনি বলেন, বাংলাদেশের তরুণ সমাজ কেবল রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়, বরং ন্যায়ভিত্তিক, জবাবদিহিমূলক, বৈষম্যহীন ও অংশগ্রহণমূলক একটি নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রত্যাশা করে। তিনি তাঁর গবেষণার ফলাফলে দেখান যে, তরুণদের প্রধান অগ্রাধিকার হলো সামাজিক সম্প্রীতি (৯২.৯%), দুর্নীতিমুক্ত শাসন (৯০%), কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা (৮৯.২%), জাতীয় মর্যাদা ও সার্বভৌমত্ব (৮৮%) এবং ন্যায়বিচারভিত্তিক রাষ্ট্র (৭৬.৭%)। তবে এসব প্রত্যাশার বিপরীতে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, বেকারত্ব, দক্ষতার ঘাটতি, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও আস্থার সংকট বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে বলে তিনি মনে করেন। সে জন্য তিনি মনে করেন যে, তরুণদের রাষ্ট্র পরিচালনা ও নীতিনির্ধারণে কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে সুশাসন, কর্মসংস্থান, জবাবদিহিতা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের মাধ্যমে একটি কার্যকর ন্যায়ভিক্তিক ‘বাংলাদেশ ২.০’ গড়ে তুলতে হবে। এই সেশনে সভাপতিত্ব করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর ও উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপ-উপাচার্য ড. দিল রওশন জিন্নাত আরা নাজনীন। এতে আলোচনায় অংশ নেন ওয়েস্টার্ণ নরওয়ে ইউনিভার্সিটি অব অ্যাপ্লায়েড সায়েন্সেস এর প্রফেসর ড. এস এম আব্দুল কুদ্দছ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. শাফিউল ইসলাম, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. মোহাম্মদ বিলাল হোসেন, ডাকসু’র ভাইস-প্রেসিডেন্ট (ভিপি) আবু সাদিক কায়েম এবং ইউনিভার্সটি অব ওয়ারইক এর মিজ নওশীন শরমিলা রিতু।