সড়ক নিরাপত্তা অ্যাডভোকেসির জন্য প্রমাণভিত্তিক বার্তা উন্নয়ন কর্মশালা অনুষ্ঠিত

0

নিজস্ব প্রতিনিধি : সেফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচের আলোকে সমন্বিত সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের আহ্বান

ঢাকা, ১৮ মে ২০২৬: প্রতিদিনের যাত্রা যেন কারও জীবনের শেষ যাত্রা না হয়, এ লক্ষ্য সামনে রেখে সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে কার্যকর অ্যাডভোকেসি, প্রমাণভিত্তিক বার্তা উন্নয়ন এবং নীতিগত পরিবর্তনের ওপর গুরুত্ব দিয়ে ঢাকায় দুই দিনব্যাপী কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

বাংলাদেশ এনজিওস নেটওয়ার্ক ফর রেডিও অ্যান্ড কমিউনিকেশন, বিএনএনআরসি-এর উদ্যোগে ১৭ ও ১৮ মে ২০২৬ ঢাকায় ‘সড়ক নিরাপত্তা অ্যাডভোকেসির জন্য প্রমাণভিত্তিক বার্তা উন্নয়ন’ শীর্ষক এ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। কর্মশালায় রোড সেফটি কোয়ালিশন বাংলাদেশ-এর সদস্য সংস্থাগুলোর রোড সেফটি প্রকল্পের প্রোগ্রাম ম্যানেজার, কো-অর্ডিনেটর এবং কমিউনিকেশন কর্মকর্তারা অংশগ্রহণ করেন।

সড়ক দুর্ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, আইন, পরিবহনব্যবস্থা, সড়ক অবকাঠামো, আচরণগত ঝুঁকি এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। অতিরিক্ত গতি, মানসম্মত হেলমেট ব্যবহার না করা, সিটবেল্ট ও শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বল প্রয়োগ, মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানো, অনিরাপদ সড়ক অবকাঠামো এবং দুর্ঘটনাপরবর্তী সেবার সীমাবদ্ধতা সড়ক নিরাপত্তার বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।

জাতিসংঘ ঘোষিত Decade of Action for Road Safety 2021–2030 এবং এর Global Plan-এ ২০৩০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু ও গুরুতর আহতের সংখ্যা কমপক্ষে ৫০ শতাংশ কমিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টের ৩.৬ এবং ১১.২ লক্ষ্যমাত্রায় নিরাপদ, সাশ্রয়ী, সহজলভ্য ও টেকসই পরিবহনব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্য অর্জনে সেফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচের আলোকে প্রমাণভিত্তিক নীতি, কার্যকর আইন এবং জনসম্পৃক্ত যোগাযোগ কৌশল অপরিহার্য।

বিএনএনআরসি রোড সেফটি কোয়ালিশন বাংলাদেশ-এর অন্যতম সদস্য হিসেবে ২০২২ সাল থেকে সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। Constructive Road Safety Journalism in Bangladesh এবং Strengthening Road Safety Legislation on Key Behavioral Risk Factors in Bangladesh through Media Development প্রকল্পের মাধ্যমে বিএনএনআরসি সমন্বিত সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন, নীতি গবেষণা, গণমাধ্যম সম্পৃক্ততা এবং সাংবাদিকদের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ধারাবাহিক ভূমিকা পালন করে আসছে।

কর্মশালার মূল উদ্দেশ্য ছিল সড়ক নিরাপত্তা অ্যাডভোকেসির জন্য লক্ষ্যভিত্তিক শ্রোতাগোষ্ঠী চিহ্নিত করা, প্রমাণভিত্তিক তথ্য-উপাত্তকে সহজবোধ্য ও প্রভাবশালী বার্তায় রূপান্তর করা, বার্তা প্রি-টেস্টিংয়ের ধারণা দেওয়া এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক কার্যকর অ্যাডভোকেসি বার্তা তৈরির কৌশল অনুশীলন করা।

কর্মশালায় বিএনএনআরসিসহ রোড সেফটি কোয়ালিশন বাংলাদেশ-এর ৮টি সদস্য প্রতিষ্ঠানের মোট ১৬ জন প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেন। অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ছিল ব্র্যাক, বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি, সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ, বাংলাদেশ (সিআইপিআরবি), ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন, ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন এবং স্টেপস টুওয়ার্ডস ডেভেলপমেন্ট।

কর্মশালায় বাংলাদেশের বর্তমান সড়ক নিরাপত্তা পরিস্থিতি, সেফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচ, সড়ক নিরাপত্তা আইন ও নীতি অ্যাডভোকেসি, কৌশলগত যোগাযোগ, লক্ষ্যগোষ্ঠী বিশ্লেষণ, প্রমাণভিত্তিক বার্তা উন্নয়ন, বার্তা যাচাই ও প্রি-টেস্টিং এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অ্যাডভোকেসি বার্তা তৈরির কলাকৌশল নিয়ে আলোচনা করা হয়। দলীয় কাজের মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীরা ফেসবুক ও লিংকডইনের জন্য পরীক্ষামূলকভাবে তিনটি অ্যাডভোকেসি বার্তা তৈরি করেন।

কর্মশালায় আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রোড সেফটি বিশেষজ্ঞ মি. রেহান উদ্দিন আহমেদ রাজু; ইউনিসেফ ঢাকার কমিউনিটি অ্যান্ড সোশ্যাল লিসেনিং কনসালট্যান্ট মিস. তিলকা বিনতে মেহতাব; এবং বিএনএনআরসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মি. এ এইচ এম বজলুর রহমান।

সমাপনী পর্বে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে সনদ প্রদান করা হয়। এ সময় অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটর (জিএইচএআই)-এর কান্ট্রি কো-অর্ডিনেটর মি. শরিফুল আলম এবং ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির রোড সেফটি প্রকল্পের প্রজেক্ট ডিরেক্টর মি. মো. বজলুর রহমান।

বক্তারা বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধযোগ্য। কিন্তু এর জন্য শুধু সচেতনতা নয়, শক্তিশালী আইন, কার্যকর প্রয়োগ, নিরাপদ অবকাঠামো, আচরণগত ঝুঁকি হ্রাস, তথ্যনির্ভর সিদ্ধান্ত এবং গণমাধ্যমের দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন। সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে অস্পষ্ট বা আবেগনির্ভর বার্তার বদলে প্রমাণভিত্তিক, লক্ষ্যভিত্তিক এবং নীতিনির্ধারণে প্রভাব ফেলতে সক্ষম বার্তা তৈরি করতে হবে।

কর্মশালা থেকে সরকার, নীতিনির্ধারক, গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের প্রতি সেফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচের আলোকে একটি সমন্বিত সড়ক নিরাপত্তা আইন দ্রুত প্রণয়ন ও কার্যকর বাস্তবায়নের আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে অতিরিক্ত গতি নিয়ন্ত্রণ, মানসম্মত হেলমেট ব্যবহার, সিটবেল্ট ও শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ, মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালনা প্রতিরোধ এবং দুর্ঘটনাপরবর্তী জরুরি সেবা শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

বিএনএনআরসি মনে করে, সড়ক নিরাপত্তা কোনো একক প্রতিষ্ঠানের কাজ নয়। এটি সরকার, আইনপ্রণেতা, গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ, পরিবহন খাত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পরিবার এবং নাগরিকদের সম্মিলিত দায়িত্ব। প্রমাণভিত্তিক বার্তা, জনসম্পৃক্ত অ্যাডভোকেসি এবং কার্যকর আইনি কাঠামোর মাধ্যমে বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু ও আহতের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব।

আপনি এগুলোও দেখতে পারেন

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না.