‘প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডার ভিত্তিক সহিংসতা: প্রতিরোধ, প্রশমন ও করণীয় এবং এনজিওদের ভূমিকা’ শীর্ষক জাতীয় পরামর্শ সভা

0

নিজস্ব প্রতিনিধি : ডিজিটাল রূপান্তরের এই সময়ে প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডার ভিত্তিক সহিংসতা বা টিএফজিবিভি একটি ক্রমবর্ধমান সামাজিক ও মানবাধিকারগত উদ্বেগ হিসেবে সামনে এসেছে। বিশেষ করে নারী, কন্যাশিশু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এ ধরনের সহিংসতার ঝুঁকিতে বেশি থাকায় সচেতনতা বৃদ্ধি, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা, আইনি সহায়তা এবং কার্যকর সমন্বয় এখন সময়ের দাবি।

এই প্রেক্ষাপটে এনজিও বিষয়ক ব্যুরো, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও বাংলাদেশ এনজিওস নেটওয়ার্ক ফর রেডিও অ্যান্ড কমিউনিকেশন (বিএনএনআরসি) যৌথ উদ্যোগে ৭ মে ২০২৬ তারিখে এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর সভাকক্ষে ‘প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডার ভিত্তিক সহিংসতা: প্রতিরোধ, প্রশমন ও করণীয় এবং এনজিওদের ভূমিকা’ শীর্ষক জাতীয় পর্যায়ের এক পরামর্শ সভার আয়োজন করে।
সভায় প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডার ভিত্তিক সহিংসতা, ডিজিটাল উন্নয়ন, এর মানসিক ও সামাজিক প্রভাব, প্রতিরোধ ও প্রশমন কৌশল এবং বিচারপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে আইনি জটিলতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। পাশাপাশি এনজিওগুলো কীভাবে তাদের চলমান ও ভবিষ্যৎ কার্যক্রমে টিএফজিবিভি প্রতিরোধের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করতে পারে, সে বিষয়েও দিকনির্দেশনা তুলে ধরা হয়।
পরামর্শ সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর মহাপরিচালক ডক্টর মোহাম্মদ জকরিয়া, সচিব। পরামর্শ সভাটি আয়োজন করা হয় ‘স্ট্রেনদেনিং রেজিলিয়েন্স এগেইনস্ট টেকনোলজি ফ্যাসিলিটেটেড জেন্ডার বেইসড ভায়োলেন্স (টিএফজিবিভি) অ্যান্ড প্রমোটিং ডিজিটাল ডেভেলপমেন্ট’ প্রকল্পের আওতায়। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে নাগরিকতা: সিভিক এনগেজমেন্ট ফান্ড (সিইএফ) কর্মসূচির অধীনে। এতে অর্থায়ন করছে সুইজারল্যান্ড, গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে জিএফএ কনসালটিং গ্রুপ।
সভা সঞ্চালনা করেন ব্যারিস্টার মোঃ খলিলুর রহমান, এনডিসি, পরিচালক (যুগ্ম সচিব), এনজিও বিষয়ক ব্যুরো। তিনি সবাইকে তাঁদের অংশগ্রহণের জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে সভা শুরু করেন এবং সভার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য তুলে ধরে বলেন, প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডার ভিত্তিক সহিংসতা বিষয়ে এনজিওদের করণীয় এবং তাদের ভবিষ্যৎ কার্যক্রমে টিএফজিবিভি সম্পৃক্তকরা খুবই জরুরি।
প্যানেল আলোচক হিসেবে অংশ নেন শাশ্বতী বিপ্লব, সহযোগী পরিচালক, ব্র্যাক; মোঃ হারুন-অর-রশিদ, প্রধান নির্বাহী, লাইটহাউস; এবং জাকির হোসাইন, প্রধান নির্বাহী, নাগরিক উদ্যোগ। সভায় বিভিন্ন খাতের ৩৮টি এনজিওর মোট ৬৭ জন প্রতিনিধি অংশ নেন।
নাগরিকতা: সিইএফ কর্মসূচি’র ক্যাপাসিটি ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট এক্সপার্ট মোঃ নুরুল ইসলাম বলেন, জেন্ডার মেইনস্ট্রিমিংয়ের মতো এখন প্রযুক্তি বিষয়টিকেও মূলধারায় আনার সময় এসেছে। এনজিও বিষয়ক ব্যুরো এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তিনি বলেন, বহু এনজিও ও নাগরিক সমাজ সংগঠন এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর সঙ্গে কাজ করছে। প্রকল্প অনুমোদনের সময় যদি প্রযুক্তি, ডিজিটাল নিরাপত্তা ও টিএফজিবিভি-সংক্রান্ত নির্দেশনা অন্তর্ভুক্ত করা যায়, তাহলে ডিজিটাল সচেতনতা তৈরিতে বড় অগ্রগতি সম্ভব।

সভায় ডক্টর কে. এম. মামুন উজ্জামান, পরিচালক (যুগ্ম সচিব), এনজিও বিষয়ক ব্যুরো বলেন, আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করার দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিচার বিভাগ ও সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর। তবে সমাজকে নিরাপদ রাখতে আইনি ব্যবস্থার পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরি। তিনি বলেন, সচেতনতা তৈরির কাজে প্রযুক্তিকে শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। বিশেষ করে কমিউনিটি রেডিও, অঞ্চলভিত্তিক গণমাধ্যম ও অন্যান্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে সচেতনতার বার্তা পৌঁছে দেওয়া এখন জরুরি।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডক্টর মোহাম্মদ জকরিয়া বলেন, টিএফজিবিভি শুধু কোনো প্রযুক্তিগত সমস্যা নয়; এটি মানবাধিকার, জেন্ডার ন্যায়বিচার, সামাজিক নিরাপত্তা, মানসিক স্বাস্থ্য, আইনের শাসন এবং সামগ্রিক উন্নয়নের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। তিনি আরও বলেন, জাতীয় পর্যায়ে এ ধরনের সহিংসতা মোকাবিলায় একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা জরুরি। একই সঙ্গে এনজিও, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী রেফারেল কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের আইসিটি কমিটি এবং সাইবার অপরাধ প্রতিরোধ কমিটির কার্যক্রমে টিএফজিবিভি বিষয়টি অন্তর্ভুক্তকরণ, তথ্যভিত্তিক নীতি প্রণয়নের জন্য নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।

মূল প্রবন্ধে বিএনএনআরসি-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এএইচএম বজলুর রহমান প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডার ভিত্তিক সহিংসতা এবং ডিজিটাল উন্নয়ন বিষয়ে একটি সেশন পরিচালনা করেন। সেশনে তিনি টিএফজিবিভির সংজ্ঞা, ধরন, ঝুঁকি, প্রভাব এবং প্রতিরোধ কৌশল নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি বলেন, প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডার ভিত্তিক সহিংসতা শুধু অনলাইনে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর প্রভাব ভুক্তভোগীর অফলাইন জীবন, মানসিক স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা এবং শারীরিক সুস্থতার ওপরও পড়ে। তিনি ভুক্তভোগীকে দোষারোপ করার সামাজিক সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে সহমর্মিতাপূর্ণ, অধিকারভিত্তিক ও তথ্যনির্ভর দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণের আহ্বান জানান। তিনি ডিজিটাল উন্নয়নের বর্তমান চিত্র, ইন্টারনেট ব্যবহার, ডিজিটাল বৈষম্য এবং নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।

সভায় উন্মুক্ত আলোচনায় ২১ জন এনজিও প্রতিনিধি অংশ নেন। তাঁরা নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রের অভিজ্ঞতার আলোকে টিএফজিবিভি মোকাবিলায় বিভিন্ন সুপারিশ তুলে ধরেন। আলোচনায় শিশু ও তরুণদের ইন্টারনেট এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আসক্তি রোধ, অনলাইন গেম ব্যবহারে সচেতনতা, ডিজিটাল ফরেনসিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, পুলিশ ও বিচার বিভাগের সক্ষমতা উন্নয়ন এবং ভুক্তভোগীবান্ধব সহায়তা ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা উঠে আসে।

অংশগ্রহণকারীরা পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন সেবার প্রচার ও পরিধি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন। এ সেবার হেল্পলাইন নম্বর ০১৩২০-০০০৮৮৮ এবং ই-মেইল ঠিকানা [email protected] সম্পর্কে তৃণমূল পর্যায়ে আরও প্রচার চালানোর সুপারিশ করা হয়।

উন্মুক্ত আলোচনায় আরও বলা হয়, জেন্ডার ভিত্তিক সহিংসতা ও টিএফজিবিভি প্রতিরোধে শুধু নারী ও কন্যাশিশুকে সচেতন করলেই হবে না; পুরুষ ও কিশোরদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনেও বিশেষ কর্মসূচি নিতে হবে। প্রান্তিক পর্যায়ের যুবসমাজকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ইতিবাচক ব্যবহার, নিরাপদ ডিজিটাল আচরণ এবং দায়িত্বশীল কনটেন্ট নির্মাণে প্রশিক্ষিত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। স্থানীয় প্রশাসন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কমিউনিটি সংগঠন এবং গণমাধ্যমকে এ প্রক্রিয়ায় যুক্ত করার সুপারিশ করা হয়।

সভায় বক্তারা বলেন, প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডিজিটাল নিরাপত্তা, জেন্ডার ন্যায়বিচার এবং মানবাধিকার সুরক্ষার বিষয়গুলোকে উন্নয়ন কার্যক্রমের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। টিএফজিবিভি প্রতিরোধে সরকার, এনজিও, নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম, প্রযুক্তি খাত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই।

সভা শেষে অংশগ্রহণকারীরা টিএফজিবিভি প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধি, রেফারেল ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ, সেবাপ্রাপ্তির পথ সহজ করা, তথ্যভিত্তিক নীতি প্রণয়ন এবং এনজিও কার্যক্রমে ডিজিটাল নিরাপত্তা ও জেন্ডার সংবেদনশীলতা অন্তর্ভুক্ত করার ওপর সম্মিলিতভাবে গুরুত্বারোপ করেন।

আপনি এগুলোও দেখতে পারেন

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না.